Bishfol – বিষফল

ছোটগল্প (কল্পনাপ্রসূত)
বিষফল    – হরবিলাস সরকার

পৌষের এক কুয়াশামাখা সকালে বড় দিদি স্নেহা ও ছোট বোন পল্লবী তাদের বাড়ির দক্ষিণ সীমানায় ছোট্ট বাগানে খেলা করতে  গিয়ে দেখে মায়ের লাগানো আমগাছটায় মুকুল এসেছে। লাফ-দড়ি খেলতে খেলতে পল্লবী স্নেহাকে শুধোয়, দিদি, অনেক আম ধরবে, তাই না? খেতে খুব মিষ্টি হবে, না রে? হ্যাঁ, তাইতো হবার কথা। এ যে-সে জাতের আম নয়। সবচেয়ে সেরা আম। গাছটাকে দেখ্ না, কত বড়সড়! কত সুন্দর! যেমন গাছ তেমনই তো ফল হবে। এটা তুই ঠিক বলেছিস দিদি। চল্ যাই, মাকে গিয়ে আনন্দের খবরটা দিই। দু’বোন ছুটতে ছুটতে আসে।

মা গালভরা হাসি নিয়ে বলে, কীরে, লাফ-দড়ির মহড়াটা ভালো করে হল? খেলায় কিন্তু পুরস্কার আনতেই হবে। পল্লবী মিষ্টি হেসে উত্তর দেয়, মা, বড় পুরস্কার আমরা পেয়ে গেছি। কী করে? বুঝিয়ে বল্ দেখি, শুনি। স্নেহা বলে, মা আমি বলছি।  বাগানের ওই আমগাছটায় এতদিনে আম ধরবে। এটাই তো বড় পুরস্কার, মা। ওঃ এই কথা!

একটু পরে মা গিয়ে দেখে, আমগাছটাকে। কুয়াশা ততক্ষণে কেটে গেছে। ঝলমলে রোদ উঠেছে। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় শাখা-প্রশাখা সহ মুকুলগুলো মৃদু আন্দোলিত হচ্ছে। মৌমাছিদের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা ছাপিয়ে মায়ের মন সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়ে উঠেছে নিজের হাতে সৃষ্টির আনন্দে। আমগাছটাকে  জড়িয়ে ধরে মা হৃদয়ের অন্তস্তলে অনাবিল আনন্দ উপভোগ করছে। মনে পড়ছে পনেরো বছর আগের সেই দিনটির কথা। নামকরা এক নার্সারি থেকে অর্ডার দিয়ে আমের চারাটি আনা হয়েছিল। বীজ থেকে তৈরি। এ জাতের আমগাছ নাকি বীজ থেকেই তৈরি হয়। গাছটা সেদিনই লাগানো হয়েছিল। দিনটি আরও স্মরণীয় যে, সেদিনই রাজ্যে নতুন শাসক মানুষের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। দিকে দিকে যন্ত্রনা-জর্জরিত মানুষগুলোর স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়েছিল। পল্লবী তখন দু’বছরের, আর স্নেহা চার বছরের। পল্লবী জন্মে তার বাবাকে দেখেনি। দেখবে কী করে? তখন চার মাসের পেটে।

সেই নিদারুণ দুঃখের স্মৃতি মা আজও বয়ে বেড়ায়। পল্লবীর বাবা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিল। স্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতি নির্বাচনের দিন নিজের চোখে দুষ্কৃতীদের হাতে একজন সৎ মানুষকে খুন হতে দেখেছিল। ঠিক দু’দিন পর আদালতে সাক্ষী দিতে যাচ্ছিল। পৌঁছানোর আগেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। মা একটা চাকরির জন্য কাতর আবেদন জানিয়েছিল। গ্রাহ্য হয়নি। ক্ষতিপূরণ বাবদ কয়েক লক্ষ টাকা ছাড়া আর কিছুই জোটেনি।

চোখের জল মোছে মা। আমগাছটাকে অনেক আদর করে, তার আরও সৌন্দর্য বৃদ্ধি কামনা করে ফিরে আসে। মাস গেলে এখন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বারোশো টাকা পায়। মেয়েরা কন্যাশ্রীর টাকা পেয়েছে। বাড়িতে একটা ছোটখাটো মুদির দোকান করেছে। আর কিছু আশা করে না।

5c6008e9d79a4ac3bfe2ddc269980f26 1 scaled

চৈত্রের মাঝামাঝি এক ঝড়ে বেশ কিছু কাঁচা আম ঝরে পড়ল। পল্লবী, স্নেহা ঝুড়ি ভরে কুড়িয়ে আনলো। কিন্তু সেই আম এতটা টক যে, কাঁচা খাওয়া তো দূরের কথা, অতিরিক্ত চিনি দিয়ে চাটনি করেও খাওয়া অসম্ভব। মেয়েদের মন খারাপ দেখে মা বুঝালো, ওরে, আমার সোনা,মণি, কাঁচায় যে আম যত টক, পাকলে ততই মিষ্টি। মা, তোমার কথা যেন সত্যি হয়। সত্যি হলে, পাকা আম দিয়ে আমরা দু’বোন মিলে আমসত্ত্ব বানাবো।

মা এবার বলে, গাছটা যখন লাগিয়েছিলাম, তখন কত ছোট ছিল! ওকে বছরের পর বছর ধরে কত পরিচর্যা করে বড় করে তুলেছি। ও এখন ফল দিচ্ছে। ওর ফল  খারাপ হতে পারে না। পল্লবী বলে, মা, বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়। স্নেহা হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। গালে হাত দিয়ে কিছু একটা ভাবছে। মা-ও নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

চৈত্র শেষ হয়ে বৈশাখ পড়ল। একদিন বিকেলের পড়ন্তবেলায় কলেজ থেকে ফিরে স্নেহা মন খারাপ করে বসে ছিল। পল্লবীও খানিক আগে স্কুল থেকে ফিরেছে। স্নেহার মুখ ভার দেখে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে রে দিদি? পল্লবী, তুই আমার ছোট বোন। তোকে বিশ্বাস করে একটা কথা বলব। মাকে বলবি না তো? আচ্ছা ঠিক আছে, বলবো না। বল্, কী কথা? আমি না একজনের সাথে ফেঁসে গেছি। ফেঁসে গেছিস! কার সাথে? জেলা সভাধিপতির ছেলে। কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। কী করে? সে কি কলেজে আসে? হ্যাঁ। আগে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিল। এখনও ওর কথাতেই ইউনিয়ন চলে। তো দিদি, তুই তার সাথে ফেঁসে গেলি কী করে? ও আমাকে ভালোবেসে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। আমি রাজি হয়েছিলাম। সেটাই আজ কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু খুলে বল্ তো, আসলে কী হয়েছে? দু’মাস আগে একদিন কলেজ চলাকালীন বেড়াতে যাবার নাম করে ও আমাকে হোটেলে নিয়ে গিয়েছিল। ঘন্টা চারেক একটা ঘরে আমরা দুজনেই ছিলাম। আমার মনে হচ্ছে, আমি নিশ্চিত, আমি মা হতে চলেছি। কী সর্বনাশ দিদি! এখন কী করবি? তাইতো রে, আমি বড়ই নিরুপায়, অসহায় হয়ে পড়েছি। ও আমাকে এখন এড়িয়ে চলতে চাইছে। শুনেছি, আমার মতো অনেকেরই এমন সর্বনাশ করেছে। ক্ষমতাশালী লোকের ছেলে বলে পার পেয়ে যাচ্ছে। পল্লবী মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে।

এরপর থেকে স্নেহা নিয়মিত আর কলেজে যায় না। মা জিজ্ঞেস করে, কীরে মা, তোর কি শরীর খারাপ? বল্, নাহয় ডাক্তার দেখিয়ে নেবো। না মা, তেমন কিছু নয়। রোজ রোজ কলেজে যেতে ভালো লাগে না। মা এসব নিয়ে আর মাথা ঘামায় না। মনে মনে বলে, যা ভালো বুঝিস, তাই কর্। কিন্তু ছোট বোন পল্লবী সে যে দুশ্চিন্তা না করে পারছেনা। কী হবে! আর যা কিছু হবে, তা যে ভালো হবে না। মা আড়াল হলে চুপিসারে শুধোয়, দিদি, এখন কী করবি? আচ্ছা পল্লবী, ওকে বেবির কথা জানিয়ে বিয়ের জন্য বাধ্য করালে কেমন হয়? একটা দুশ্চরিত্র ছেলে তোর কথায় বাধ্য হবে, কী করে এতটা নিশ্চিত হচ্ছিস? স্নেহার চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। ওদের বাইরেটায় ভদ্র বেশ, মানুষের কল্যাণের জন্য নিবেদিত প্রাণ, ভেতরে নোংরা আবর্জনায় ভরা। আগে বোঝার উপায় ছিল না রে। এখন প্রায়শ্চিত্ত যা করার, তা তো আমাকেই করতে হবে। আমার এক মন বলছে, নার্সিংহোমে গিয়ে মুক্ত করে নিই। আরেক মন বলছে, সে তো পরাজয়, হার মানা। কী যে করবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। …….।

দুর্ভাবনার দিনগুলো একে একে পার হতে থাকে। পেটের ভেতরের জীবটাও রক্তমাংসের আকার নিতে থাকে। দুই বোনের জীবনের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস স্তিমিত হয়ে বিষাদে রূপান্তরিত হয়েছে। স্রোত হারানো নদীর মতো আশাহত, ম্রিয়মাণ। মা ভাবে, মেয়েরা বড় হয়ে উঠেছে। শান্ত হয়ে যাওয়াটা বুঝি তারই লক্ষণ।

বৈশাখের শেষে গাছের আমগুলো দুধে-আলতা রং ধরে বেশ পেকে উঠেছে। পল্লবী আর মা গিয়ে এক ঝুড়ি আম পেড়ে নিয়ে এল। ততক্ষণে সূর্য অস্তরেখায়। রাতে গোটা কয়েক আম কেটে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হল। প্রথমে পল্লবী এক টুকরো  মুখে দিতেই নিমেষে পেটের নাড়ীভুঁড়িগুলো বেরিয়ে যাবার উপক্রম হল। মা খেয়োনা, ফেলে দাও। মারাত্মক তেতো। কী গাছ লাগিয়েছিলে মা! মা বিস্ময় প্রকাশ করল, গাছটা ভারী সুন্দর, আর তার ফলগুলো এত বিশ্রী! মা, ফল থেকে আসে বীজ। বীজ থেকে গাছ হয়। গাছ থেকে আবার সেই ফলই তো পাওয়া যাবে। মায়ের  মনটা বিষন্নতায় ভরে উঠল।

পল্লবী দিদির বিছানায় গিয়ে বসল। রাতে শুয়ে দিদির সাথে আজ সুখ-দুঃখের অনেক কথা বলল। দিদি জ্ঞানে-বিজ্ঞানে আমরা অনেক এগিয়েছি। কিন্তু সমাজটা গভীর অন্ধকারে ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছে। মানুষগুলো যেন পশুর চেয়েও অধম হয়ে যাচ্ছে। পুরুষের অবাধ স্বাধীনতা। ভালোবাসাটুকুও মেয়েদের কিনতে হয় শরীরের বিনিময়ে। তবুও কি পাওয়া যায়? শরীরটাকে পিষে পিষে নিংড়ে নিয়ে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেয়। ……..। একসময় পল্লবী ঘুমিয়ে পড়ে। দুশ্চিন্তায় বিনিদ্র রাত জাগে স্নেহা।

ভোর হয়। স্নেহার ক্লান্তির চোখে ঘুম ধরে। পল্লবী উঠে পড়ে। মা আওয়াজ পেয়ে উঁকি মেরে জিজ্ঞেস করে, কীরে ছোট, তোর দিদি ওঠেনি? শরীর খারাপ? হ্যাঁ মা, দিদিকে ডেকো না। আজ দিদি কলেজেও যাবে না।

এরপরও ক’দিন স্নেহা কলেজে যায়নি। এক দুপুরে তার ফোনটা বেজে উঠল। পল্লবী কাছেই ছিল। দিদি, তোর ফোন। কে করেছে? বাঁশ নামে একজন। কে এই বাঁশ, দিদি? কে আবার? যে আমাকে বাঁশ দিয়েছে, সে। দে আমাকে ফোনটা। দেখি, কী বলতে চায়।

বলো, কী বলবে। স্নেহা, তুমি কলেজে আসছো না কেন? হঠাৎ আমার খোঁজ? বড়ই ক্ষুধার্ত? আর বুঝি কোন শিকার ধরতে পারোনি? ছি! এমন করে বলছ কেন? আমি কি তোমার খোঁজ নিতে পারি না? শুধু খোঁজ কেন, এবার যে তোমাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পিতার দায়িত্ব। পিতার দায়িত্ব? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো। তোমার বংশধর আমার পেটে। তোমার-আমার ভালবাসার আশীর্বাদ  না অভিশাপ, আমি জানিনা। ক্ষণিক চুপ করে থাকার পর বাঁশ উত্তর দিল, ঠিক আছে, কাল কলেজে এসো। অবশ্যই এসো। আজ যা অভিশাপ বলে ভাবছো, কাল তা আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।

দিদি, বাঁশ কারও নাম হয় নাকি রে? তা আবার জেলা সভাধিপতির ছেলের নাম! না, ওই নামে সবাই ডাকে। কলেজে ও সবার বাঁশদা। আসল নাম বাঁশরি বন্দ্যোপাধ্যায়। বাঃ বাঁশরি মিষ্টি সুরে গান না শুনিয়ে তোকে বাঁশ দিয়ে দিল? এটা তোর হেঁয়ালি করার সময়? না রে, হেঁয়ালি করছি না। আসলে দিদি, ভয় করছে আমার। যদি আরও ভয়ঙ্কর কোন বিপদ হয়। বাঁশ শিল্পীর হাতে পড়লে বাঁশরি হয়, আর অমানুষের হাতে পড়লে লাঠি হয়। চারদিকে এখন কী সব ঘটছে! কোথাও চরিত্র গঠনের শিক্ষা নেই। না কোন স্কুল-কলেজে, না কোন রাজনৈতিক শিবিরে। শুধু মুখোশ পরা মানুষ। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক রথীনবাবু বলেন, এই পঙ্কিলতার মধ্যেও এখনও কিছু ভালো মানুষ আছেন। তাঁরা সমাজে উপেক্ষার পাত্র। তিনি বলেন, শিক্ষা এখন শুধুই ডিগ্রি লাভ। সেই ডিগ্রি কেনাও যায়। মূল্যবোধের, মর্যাদাবোধের শিক্ষা না থাকলে মানুষ মনুষ্যেতর প্রাণীর স্তরে নেমে যায়। বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, গার্গী, মৈত্রেয়ী, রোকেয়া,  নিবেদিতারা তাদের মাথায় আসে না। আরও দুর্ভাগ্য, তারাই যদি হয় সমাজের মাথা। থাক এসব কথা। দিদি, কাল তুই সত্যিই কলেজে যাবি?

8ee232df26af4671b0a13f9123bcebdb scaled

পরদিন স্নেহা বড় আশা নিয়ে সত্যিই কলেজে গেল। দিন শেষ হয়ে রাত নেমে এলো পৃথিবীর উপর। সে আর ফিরে এলো না। দু’দিন পর চালতার বিলে ভেসে ওঠা মৃতদেহটাকে নিয়ে আসা হল বাড়িতে।

মায়ের আর ছোট বোনের বুকফাটা কান্নায় বাংলার আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ হতে লাগল। পুলিশের বড়কর্তা টিভিতে বিবৃতি দিলেন, অভিযুক্ত পলাতক। অনুসন্ধান চলছে। শাসকের পদস্থ লোকেরা বললেন, দোষী প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে। নেতারা বললেন, অপরাধীর কুকর্ম ব্যক্তিগত, দলের সংস্কৃতি নয়। দল তাকে বহিষ্কার করেছে।

………………………………………………