|
ছোটগল্প |
| হৃদয় চুরি | – হরবিলাস সরকার |
অবশেষে শুভাশীষ ব্যাটারি চালিত রিকশা চালাতে আরম্ভ করল। লোকমুখে এই রিকশা আসলে টুকটুক বলেই বহুল পরিচিত। কোন এক মালিকের এই টুকটুক। দিনশেষে মালিকের খাতায় ১৫০ টাকা জমা করতেই হবে। বাকি যা পড়ে থাকে, নিয়ে এসে শুভাশীষ স্ত্রীর হাতে দেয়। ওই দিয়ে আগামীকালের চাল, ডাল, আলু, কাঁচালঙ্কা কেনা হবে। সব দিন তো সমান যায় না। মাসের শেষে মুদির দোকানে বেশকিছু টাকা ধারও হয়ে যায়। আর এভাবে ধারের অংক ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
ফাল্গুনের কুড়ি তারিখ দিনটা আবার ফিরে এসেছে। এই দিনেই জন্মেছিল সনু। তিন বছরের এক রতি ছেলে। প্রতিদিনের মতো আজও ঘুম থেকে উঠে খ্যান খ্যান করছে, বায়না ধরছে মায়ের কাছে, মা, আমি মাছ খাবো। ও মা, আমি ডিম খাবো।
মায়ের অন্তর কেঁদে ওঠে। হে ঠাকুর! এ দুঃখ আমি সইতে পারছি না। অবুঝ দুধের শিশুটাকে কী করে বোঝাবো, সংসারে বড় অভাব! এই বুঝি আমার ভাগ্যে ছিল! একটু পরেই মাছওয়ালা ‘মাছ মাছ’ করে হাঁক দিয়ে চলে যাচ্ছিল পাশের রাস্তা দিয়ে। তাকে ডেকে একটু মাছ কিনল মালিনী। দোকান থেকে একটা ডিমও কিনে আনল।
রাতে শুভাশীষ ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরলে ছোট্ট সনুটা দৌড়ে আসে। মুখ ভার করে বলে, বাবা, আমার গাড়িটা ভেঙে গেছে। এখন আমি কী নিয়ে খেলব? শুভাশীষের মনটা দুঃখে ভেঙে পড়ে। তবুও হাসতে হাসতে ছেলেকে সান্ত্বনা দেয়, হ্যাঁ বাবা, একটা নতুন গাড়ি কিনে দেব। আরও অনেক খেলনা কিনে দেব। সনুর মুখে হাসি ফোটে।
রাত এক প্রহর শেষে সনু ঘুমিয়ে পড়লে মালিনী শাসন করে স্বামীকে, কেন মিথ্যে আশা দিয়ে রাখলে ছেলেকে? দুদিন পর যখন দেখবে, বাবা তো ওর গাড়ি কিনে দিল না, তখন কী করে সামলাবে? এ ছাড়া আর যে উপায় ছিল না। তোমার একটা শাড়িও না হলেই নয়। কী দিয়ে যে কী করব, বুঝে উঠতে পারছি না। ওগো, শাড়ি এখন থাক। ওর দুধ ফুরিয়ে গেছে। এক কৌটা দুধ কিনতে হবে। ওকে গরুর দুধ খাওয়ালে হয় না? কৌটার দুধ খেয়ে এসেছে এতদিন। গরুর দুধ কি খাবে? খেলে তো ঘোষের কাছ থেকে নিতে পারতাম। দেখি, তা-ই নাহয় অভ্যাস করাবো। কিন্তু তাতেই বা খরচ কী এমন কমবে? জল মেশানো দুধ, দামও বেশি। কীগো, চুপ করে গেলে যে? জানো মালিনী, বিপদ যখন আসে, চারদিক থেকেই আসে। টুকটুক স্ট্যান্ডে আজ প্রচণ্ড ঝামেলা হয়েছে। ইউনিয়নের চালকরা নতুন কাউকে আর ঢুকতে দিচ্ছে না। প্যাসেঞ্জারে টান পড়েছে। এদিকে পুলিশও যেখানে সেখানে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। তাহলে আমরা প্যাসেঞ্জার তুলব কোথায়? এ তুমি কী শোনালে সনুর বাবা! হতভাগ্য যেদিকেই যেতে চায়, সেই পথই বন্ধ হয়ে যায়। বাবার প্রেসারটা আবার বেড়েছে। মায়ের কোমরের ব্যথাটাও বেড়েছে। ডাক্তার দেখাতে হবে। সনুটা সারাক্ষণ দাদু আর ঠাকুমা ঠাকুমা করে। আমি ওনাদের সাথে খেলতে দিই না। মায়ের কখন কোথায় লেগে যায়। বাবা মাথা ঘুরে পড়ে গেলে সামলানোর উপায় থাকবে না। বাবার প্রেসারের ওষুধে কি কাজ হচ্ছে না? মনে হচ্ছে, ওষুধটা পাল্টাতে হবে। তাহলে তো ডাক্তার দেখাতেই হবে। ঠিক আছে, এখন আর চিন্তা করো না। ঘুমিয়ে পড়। সকাল সকাল আবার উঠতে হবে। ঘুম কি সহজে আসবে? জানি, তবু চেষ্টা করো। একটা কাজ করো না ওগো, তুমি আমাকে ক’টা টিউশন ধরে দাও। বাড়িতে বসেই পড়াবো, বিকেলে। এই বেকারত্বের যুগে নতুন করে আবার এতগুলো মানুষ বেকার হয়ে গেল। তাতে যে টিউশনের বাজারেও আকাল। হতাশার অন্ধকারে ডুবে যায় মালিনী। নিশুতি-প্রহরে তন্দ্রা আসে দু’জোড়া চোখে।
কিছুদিন পর শুভাশীষ একটা কাজের খবর পেল। কাজ বলতে জেলার এক জজ সাহেবের দুই ছেলেমেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া আর নিয়ে আসা। বাড়ি ফিরে কথাটা মালিনীকে বলল। মালিনী এক কথায় বলে দিল, ওগো, কাজটা ধরো। বাধা কাজ। বাকি সময় যেমন করছ তেমনই করবে। একটু তো বাড়তি সুরাহা হবে।
পরদিন থেকেই কাজটা শুরু করল শুভাশীষ। এক মাসের ২০০০ টাকা গাড়ি ভাড়াটাও আগাম চেয়ে নিল। ভেবেছিল, মালিনীর একটা শাড়ি, সনুর খেলনা গাড়িটা কিনবে আর মুদির দোকানের কিছুটা ধার মেটাবে। স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে বেরোবে, এই আনন্দে সকাল সকাল বাড়িও ফিরেছিল। কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হল না। বাবার অবস্থা হঠাৎ এতটাই খারাপ হয়ে পড়ল যে, দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে জরুরি বিভাগে ভর্তি করানো হল। সারারাত রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর ভোরে ডাক্তারবাবু বললেন, এ যাত্রা উনি বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে গেছেন। তবে সাবধানে রাখবেন।
শুভাশীষ দুশ্চিন্তা নিয়েই বাবাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনল। ওষুধপথ্য যেটুকু যা প্রয়োজন, নিয়ে এসেছে। প্রতিবেশীরা অনেকে এসে সাহস জুগিয়ে গেল। কিন্তু মুদি-দোকানদার এসে নির্লজ্জভাবে কথা শোনাল, পাওনা না মেটালে আমি আর ধারে জিনিস দেবো না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মরার উপর আবার খাঁড়ার ঘা এসে পড়ল। মালিক এসেছে টুকটুক নিয়ে যেতে। গতকালের টাকা জমা না দেওয়ায় সে পরিষ্কার বলে দিল, দেখ বাপু, তুমি কথা নড়চড় করেছ। আমি আর তোমাকে গাড়ি দেব না। লোনের কিস্তির টাকা না দেওয়ায় বিকেলে ব্যাংক থেকেও নোটিশ এসেছে। শুভাশীষের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মালিনী বুক শক্ত করে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়াল। শেষ সম্বল হাতের দুখানা সোনার চুড়ি খুলে দিয়ে বলল, ওগো, অভাব যাদের নিত্যসঙ্গী, তাদের জীবনে অলংকারের সাজ নিরর্থক বিলাসিতা। বরং এ দুটো বেচে দিয়ে লোনের টাকাটা শোধ করে দাও। দোকানের পাওনা আর টুকটুকের জমার টাকাটাও মিটিয়ে দাও। তারপর খোঁজ করে পুরানো একটা টুকটুক কেনো।
মনটা ব্যথায় ভারাক্রান্ত হয়ে গেল শুভাশীষের। সহধর্মিণীকে দুঃখ করে বলল, মালিনী, একটা একটা করে সবই তো খোয়ালাম। যদি কোনোদিন আরও বড় কোন বিপর্যয় আসে, তখন কী দেবে ? তেমন নিদারুণ দুঃসময় যদি আসে, সেদিন জীবনকে নাহয় মৃত্যুর কোলে সঁপে দেবো। যাও। এখন তো বাঁচি। শুভাশীষ অনিচ্ছায় চুরি দুটো পকেটে নিয়ে বাজারের দিকে রওনা হল।
দিন কয়েক পর পড়ন্তবেলায় সদর শহরের উত্তরে পিচ-রাস্তার মোড়ে দোতলা বাড়িটায় মৃদু খুশির হাওয়া বইতে লাগল। এটাই শুভাশীষের বাড়ি। সে পুরানো একটা টুকটুক কিনেছে। যেখানে যা ধার ছিল সব শোধ করে দিয়েছে। মালিনী সপ্তম শ্রেণীর দুজন ছাত্র নিয়ে বাড়িতে টিউশন শুরু করেছে। এই আনন্দের মধ্যেও ছোট্ট সনু মুখ কালো করে বসে ছিল। মালিনী তার শাড়ির আঁচলের ছেঁড়া অংশটা শত চেষ্টা করেও লুকোতে পারল না। নিমেষে শুভাশীষের ভেতরটা অসীম যন্ত্রণায় কাতর হয়ে উঠল। ছেলের খেলনা গাড়িটা যে কেনা হয়নি। মালিনীর শাড়িটাও কিনতে পারেনি। তবুও ছেলেকে বুকে টেনে নিল। ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিল মালিনীও।
রাতে আজ ঘুম হল একটু শান্তিতে। ঘুমের মাঝে স্বপ্নে বিভোর হল শুভাশীষ। ফেলে আসা দিনের সুখের স্মৃতির পাতাগুলো একে একে উল্টাতে লাগল। উচ্চ বিদ্যালয়ে সহ-শিক্ষকের পদে যোগদান করে বাড়ি ফিরেছে সে। বাবা-মা তাকে আদর করে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন একে একে আসছেন তাকে দেখতে। তারা মিষ্টিমুখ করে ফিরে যাচ্ছেন। তারপর কয়েক মাস পর মালিনী এল ঘরে আলতা পায়ে, কপালে সিঁদুর আর মাথায় মুকুট পরে। বছর পরে ঘর আলো করে এল সনু। ভালোই কাটছিল দিনগুলি। তারপর একদিন হঠাৎ ধেয়ে এল প্রবল সুনামি। সে চিৎকার করে উঠল। ঘুম ভেঙে গেল। মালিনী জিজ্ঞেস করল, ভয়ানক স্বপ্ন দেখেছিলে বুঝি? ভোর তখন পাঁচটা।
ছোট্ট সনু তখনও ঘুমোচ্ছে। শুভাশীষ প্রাতঃকাজ সেরে চা-বিস্কুট খেয়ে টুকটুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। একটু পরে সনু ঘুম থেকে উঠে আজ আবার মায়ের কাছে খেলনা গাড়ির জন্য বায়না ধরল। মা গালে চুমু খেয়ে সোহাগে ভরিয়ে দিল। সান্ত্বনা দিল, হ্যাঁ সোনা, তোমার জন্য একটা সুন্দর খেলনা গাড়ি কিনে আনবে তোমার বাবা। তোমার শাড়ি কিনবে না? হ্যাঁ তো, শাড়িও কিনবে।
ক’দিন টুকটুক চালিয়ে শুভাশীষের ভালোই রোজগার হয়েছে। মাঝে দু’টো দিন, তারপরই নববর্ষ। বাড়ি থেকে এদিন বেরোনোর সময় সে ছেলেকে বলে গেল, আজ তোমার গাড়ি, নতুন জামা কিনে আনব। তোমার মায়ের শাড়ি, ঠাকুমা, দাদুর জন্যও নতুন জামা-কাপড় কিনে আনব। সনু মনের আনন্দে নেচে উঠে বাবাকে হাত নেড়ে নেড়ে টা টা দিল।
দুপুরে বাড়িতে আজ আবার আচমকা এক অমঙ্গল দেখা দিল। সনুর ঠাকুমার এমনিতেই কোমরে ব্যথা ছিল। তার উপর কলপাড়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে পায়ে প্রচণ্ড চোট পেয়েছে। মালিনীর ফোন পেয়ে ছুটে এল শুভাশীষ। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তারবাবু এক্সরে করতে বললেন। ঘন্টা দুয়েক পর জানা গেল, ডান হাঁটুর হাড়ে চিড় ধরেছে। চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি রইল না।
নববর্ষের দিন সকালে সনু নতুন জামা, খেলনা গাড়ির জন্য কান্নাকাটি শুরু করেছে। গতকাল শুভাশীষ কোলকাতা গিয়েছিল। গভীর রাতে বাড়ি ফিরেছে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে। যন্ত্রণা-জর্জরিত অধৈর্য মনে সহসা ছেলের গালে সপাটে চড় বসিয়ে দিল। মালিনী নিদারুণ যন্ত্রণায় অসহনীয় হয়ে উঠল। কোনদিন যা বলেনি, ভাবেওনি, আজ ক্রোধে অন্ধ হয়ে অত্যন্ত রূঢ় কত কথাই না শুনিয়ে দিল স্বামীকে। শুভাশীষ অশ্রুসিক্ত ছেলের মুখের দিকে একটিবার তাকিয়ে নিজের চোখের জল মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেল টুকটুক নিয়ে।
সনু কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। মালিনী স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে গিয়ে আরাধ্য দেবতার কাছে কান্নাকাটি করল। আমার অপরাধ তুমি ক্ষমা করে দিও। স্বামীর জন্য প্রার্থনা করল, ঠাকুর, ওকে তুমি ভালো রেখো। ……।
বেলা দশটায় আজ স্কুল ছুটি হলেও শুভাশীষ গিয়ে উঠল বিচারপতির বাড়ির দরজায়। তাঁর স্ত্রীর কাছে অনুনয়বিনয় করে এক মাসের টাকা ধার চাইল। কিন্তু ম্যাডাম সোজাসাপ্টা বলে দিলেন, আর আগাম টাকা দিতে পারব না। আগের ধারই তো শোধ করোনি, শুভাশীষ। না না, জজ সাহেব শুনলে আমাকে বকবেন। তবুও ম্যাডাম শুভাশীষকে ভেতরে ডেকে নিয়ে বৈঠকখানায় বসালেন। নববর্ষের দিন কেউ এলে নিজের হাতে কিছু না খাইয়ে তিনি যেতে দেন না। ভেতর থেকে প্লেট-ভর্তি নানারকম মিষ্টি আর জল নিয়ে এসে বললেন, খাও ছেলে। আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসি, এই বলে আবার ভেতরে চলে গেলেন।
কতদিন ধরে এমন মিষ্টি খায়নি শুভাশীষ। মিষ্টি তুলে মুখে দিতেই সনুর মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। খেতে পারল না। টেবিলে ফুলদানির পেছনে একটা ক্যারি প্যাকেট পড়েছিল। সেই প্যাকেটের ভেতরে একটু জল বুলিয়ে নিয়ে মিষ্টিগুলো ভরে নিল শুভাশীষ। মনে মনে ভাবল, গাড়ি কিনে দিতে নাইবা পারলাম, মিষ্টিগুলো পেয়ে আমার সনু মহানন্দে খাবে। ওই তো ঘরের কোণায় একটা খেলনা গাড়িও পড়ে আছে। পুরানো হলেও বেশ সুন্দর, নতুনের মতোই। যাই, ওটাকে নিয়ে গিয়ে টুকটুকের সীটের তলায় রেখে আসি। সনু দেখামাত্রই আনন্দে লাফিয়ে উঠবে। বলবে, বাবা আমার জন্য গাড়ি নিয়ে এসেছে। মনে হয়, জজ সাহেবের ছেলেমেয়েরাও ছোটবেলায় এই গাড়িটা নিয়ে খেলা করত। এখন নিশ্চয়ই আর খেলে না। কিন্তু পরের জিনিস না বলে নেওয়া তো চুরি করা। ধরা পড়লে যে চোর বদনাম কুড়োতে হবে। কোমরে দড়ি পড়বে। কিন্তু কী করব? নাঃ, খালি হাতে আজ আমি খোকার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারব না। হে ঈশ্বর, আমার অপরাধ মার্জনা করো। ভাবতে ভাবতে খেলনা গাড়িটা আর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে দরজার ওপাশে পা ফেলতেই হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল শুভাশীষ। ঠিক তখনই ম্যাডাম এসে পেছন থেকে হাঁক ছাড়লেন, শুভাশীষ, কী ব্যাপার? কোথায় যাচ্ছিলে? একি, তোমার হাতে খেলনা গাড়ি কেন? চুরি করে পালাচ্ছিলে? আমার ছেলেমেয়েরা, এত বড় হয়েছে, এই গাড়িটা নিয়ে আজও খেলা করে। ছি! ছি! তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম। কথায় কথায় ইংরেজি বল, ভাল মানুষ সাজো, এই তার নমুনা? তুমি জানো, তোমার কী শাস্তি হতে পারে?
শুভাশীষ ডান দিকের ব্যথা পায়ে ব্যথা পাওয়ায় উঠে দাঁড়াতে না পেরে মেঝেতে বসেই পা-টা ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। জীবনের করুণ কাহিনীটা ভেবেছিল ভুলে যাবে। পারল না। দুঃখের স্মৃতিগুলো এক ঝটকায় চোখের সামনে ভেসে উঠল। ম্যাডাম, আমি চোর নই। তবু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে আজ আমি সত্যিই চোর। দুধের শিশুটাকে নববর্ষের দিনে একটা নতুন জামা কিনে দিতে পারিনি। কবে থেকে একটা খেলনা গাড়ির জন্য বায়না ধরেছে! কিনে দিতে পারিনি। মুহূর্তকালে ম্যাডামের ভেতরটা করুণার উষ্ণ স্রোতে বিগলিত হয়ে উঠল। শুভাশীষকে ধরে নিয়ে এসে চেয়ারে বসালেন। পাজামার ডান-দিকের বেশ খানিকটা অংশ ছিঁড়ে গেছে। সেই ফাঁক দিয়ে ব্যান্ডেজে মোড়ানো পা দেখা যাচ্ছে। ম্যাডাম আতকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার হাঁটুতে ওটা কীসের আঘাত ? পুলিশ মেরেছে। কেন?
হতভাগ্যের জীবনগাথা, শুনবেন? আমার জীবনের একটি অধ্যায়ে স্বর্নযুগের সূচনা হয়েছিল। তবে বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। আমি নারায়ণপুর উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষকের চাকরি পেয়েছিলাম। ইংরেজি পড়াতাম। একদিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়ে গেল। আমিও তাদেরই একজন হতভাগ্য। অথচ যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই চাকরিটা পেয়েছিলাম। যোগ্য শিক্ষকদের চাকরি বাঁচানোর আর্জি নিয়ে মিছিলে সামিল হয়েছিলাম। এই ছিল অপরাধ।
ম্যাডাম কিছুক্ষণ পলকহীন চোখে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, শুধু একটা ভুলে, তা যেকোনো কারণেই হোক, তোমরা বলি হয়েছো। বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে উঠত না, যদি যোগ্য-অযোগ্যদের তালিকাটা দেওয়া হত। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে শুভাশীষ ওঠার চেষ্টা করছিল। ম্যাডাম বললেন, একটু বস। আমি ভেতর থেকে আসছি। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, জজসাহেব আসছেন। শুভাশীষ করজোড়ে কেঁদে উঠল, ম্যাডাম, আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন তো? না, কিছুতেই না। তুমি দাগি আসামি। ক্ষণিক পরে হাসতে হাসতে বললেন, তুমি আমার হৃদয় চুরি করেছ। শুভাশীষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই জজসাহেব প্রবেশ করলেন। তিনি শুভাশীষের হাতে একটা খাম দিয়ে বললেন, তুমি আমার পুত্রসম। আজ নববর্ষের দিন, এটা আমার স্ত্রীর পক্ষ থেকে তোমাকে উপহার। এতে যা আছে, আশাকরি পরিবারের সবার নতুন পোশাক আর ছেলের জন্য একটা ভালো খেলনা গাড়ি কিনতে পারবে। আর একটা কথা, তুমি চাইলে, আমার ছেলেমেয়েরা বেসরকারি একটা ভালো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে, সেখানে শিক্ষকতা করতে পারো। কোনো পরীক্ষা বা ইন্টারভিউর প্রয়োজন নেই।
শুভাশীষ অশ্রুনয়নে দু’জোড়া পায়ের ধূলো মাথায় নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হল।
……………………………………………………..