কালো হীরে – Kalo Heere

গল্প
কালো হীরে
হরবিলাস সরকার

জীবনের প্রভাতবেলায় সূর্য স্বপ্ন দেখত – সে বড় বিজ্ঞানী হবে। সেই স্বপ্ন আর মা-বাবার প্রেরণা বুকে নিয়ে সে কৈশোরে পদার্পণ করেছে। শহরতলীর ভাগীরথীর তীরে ছোট্ট জীর্ণ টালির বাড়িটার রৌদ্র-ছায়ায় বসে সে তার লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে চলেছে। দু’বছরের ছোট বোন বিনীতাও পড়াশোনায় ভালো। সংসারে দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কষাঘাত। তার উপর শহরের নামকরা বেসরকারি স্কুলের খরচ জোগাতে হয়। যদিও তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। হার না মেনে শুধুই এগিয়ে যাবার শপথ। বাবা ট্রেনে ট্রেনে মশলা-মুড়ি বেচে। মা বাড়িতে একটা ছোট্ট মুদির দোকান চালায়। মা-বাবা দু’জনই স্কুলের গণ্ডি পেরোলেও কলেজের দরজায় পৌঁছাতে পারেনি। সেই অপূরিত স্বপ্ন আজও তাদের কুরে কুরে খায়। তবুও সোনা-মনির মুখের দিকে তাকিয়ে আশার আলোয় বুক ভরে ওঠে।

সূর্য চতুর্থ শ্রেণীতে প্রথম হয়েছে। একইসঙ্গে বৃত্তি পরীক্ষায় রাজ্যে প্রথম দশ জনের মধ্যে একজন হয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। বিনীতাও দ্বিতীয় হয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠেছে।

মায়ের খুশির সীমা নেই। আজ নতুন বছরের প্রথম দিন। সে সোনা-মনির জন্য স্কুলের পোশাক কিনে এনেছে। শীতের পোশাকও কিনে এনেছে। কাল এই পোশাক পরেই ওরা স্কুলে যাবে। কিন্তু পোশাক দেখেই সূর্যর বড়ই মন খারাপ। বলল, মা, এ তুমি কী করেছো? আমার যে পড়াশুনা করার আকাঙ্ক্ষাটাই নষ্ট হয়ে গেল? কেন বাপ, পছন্দ হয়নি বুঝি? না মা, তুমি তো সবচেয়ে দামি পোশাকই কিনে এনেছ। আসলে মা, এত ভালো পোশাক পরলে আমার ভেতরের লড়াইটা হারিয়ে যাবে। বড়লোকের ছেলেমেয়েরা টিফিনে যেসব খাবার খায়, তুমিও সেসব কিনে এনেছ। কেন এনেছো মা? আমি যদি সেদ্ধ ভাত খেয়ে, আর শুকনো রুটি নিয়ে স্কুলে যাই, আমার ভেতরে এক অদম্য ইচ্ছে-শক্তি জেগে ওঠে। আমি মরীয়া হয়ে উঠি। মনে হয় সকলকে পেছনে ফেলে আমি এগিয়ে যাব। কোন বাধা আমাকে আটকাতে পারবেনা। মায়ের চোখে জল আসে। বলে, ওরে গরীব হলেও আমাদেরও তো ইচ্ছে হয়, ছেলেমেয়েকে ভালো পরাবো, ভালো কিছু খাওয়াবো। মায়ের চোখের জল মুছে দেয় সূর্য। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন পাটে বসেছে। বিনীতা আয়না-চিরুনি, তেল, ফিতে নিয়ে এসে বলে, মা, কোনদিন তো সাজো না। আজ আমি তোমাকে নিজের হাতে সাজিয়ে দেবো। অকৃত্রিম স্নেহে মা হাত বুলিয়ে দেয় মেয়ের মাথায়।

পরদিন দুই ভাই-বোন স্কুলে যাবার আগে নতুন পোশাক পরে এসে মা-বাবাকে প্রণাম করে বলল, তোমরা আমাদের আশীর্বাদ কর। মা সোনা-মণিকে বুকে টেনে নিল। বাবা ওদের মাথায় হাত রেখে মঙ্গল কামনা করল। এরপর সূর্য নতুন পোশাক খুলে পুরানো পোশাক পরে বাবা-মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালো। মাকে বলল, বোনের তো গতবারের পোশাক ছিঁড়ে গেছে। কিন্তু আমারগুলো বেশ ভালো আছে। এগুলো আরও কিছুদিন পরা যাবে। নতুন পোশাক পরিনি বলে দুঃখ পেও না। বাবাকে কানে কানে বলল, তোমার জামাটাও তো বেশ পুরানো হয়ে গেছে। ভারী শ্রীহীন দেখাচ্ছে। মায়ের শাড়িতেও সেলাই পড়েছে। আমি কী করে নতুন জামা-প্যান্ট পরে স্কুলে যাই, বলতো? মা শুনতে পেয়ে আঁচলে চোখ মোছে। সকাল থেকে ঘন কুয়াশায় আকাশে সূর্যের দেখা মেলেনি এখনও। কিন্তু সূর্য তো তার ঘরে উঠেছে, একেবারে কাছে। তার অন্ধকারময় জীবন আলোয় আলোময় করে ফুটে উঠেছে। বিষাদের মাঝেও মা তাই এখন হৃদয়ে অনুভব করছে অপার আনন্দ। বাবা দেরি না করে প্রতিদিনের মতোই দুই ছেলেমেয়েকে সাইকেলে চাপিয়ে রওনা দিল স্কুলের পথে। ফিরে এসে কাজে যাবে। মা কুয়াশা ভেদ করে চেয়ে চেয়ে দেখে।

ছ’মাস পর প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষা হল। ফল বেরোনোর দিন মা অনেকক্ষণ আগে গিয়েই স্কুলের দরজায় অপেক্ষা করছিল। ছুটির ঘন্টা বেজে উঠতেই সূর্য বাইরে বেরিয়ে এল। দেখল, মা উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছে। মাকে প্রণাম করে বলল, মামনি, তোমার ছেলে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছে। অশ্রুসিক্ত চোখে মা জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁরে, নীল নামে একটা ছেলেও বলল, সে প্রথম হয়েছে। একই শ্রেণিতে দু’জন প্রথম? হ্যাঁ মা, যুগ্ম প্রথম। বিনীতাও সহাস্যে এসে মাকে প্রণাম করে বলল, আমি দ্বিতীয় হয়েছি মা। মেয়ের গালে চুম্বন এঁকে দিল মা। এরপর তিন জন হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে রওনা হল। মায়ের কৌতূহলী মনে অনেক প্রশ্ন। হ্যারে বাপ্, প্রধানের মেয়ে, ডাক্তারবাবুর মেয়ে, এম.এল.এ’র যমজ ছেলেরা তো তোর ক্লাসেই পড়ে, ওরা কেমন রেজাল্ট করেছে? ওদের ক্রমিক নাম্বার প্রথম দশ জনের মধ্যেই আছে মা। তাহলে তো রেজাল্ট ভালই করেছে। করবেই না কেন? ঘি, দুধ খাওয়া ছেলেদের ব্রেন বলে কথা। তার উপর সকাল-বিকেল বাড়িতে গৃহশিক্ষক আসেন পড়াতে। মাথায় কাঁড়ি কাঁড়ি জ্ঞান-বুদ্ধি ঠেসে ঠেসে ঢুকিয়ে দিলে সেই ছেলেরা কি বিদ্যের জাহাজ না হয়ে পারে? মা, গরিবের ছেলেমেয়েরাও বিদ্যার জাহাজ হতে পারে। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছে গরিব ঘরে। স্যার আইজ্যাক নিউটন, আইনস্টাইন, এঁনারা দারিদ্রের সাথে লড়াই করেই জ্ঞানের উচ্চ শিখরে উঠেছিলেন। আমাদের বঙ্গদেশেও তেমনি একজন বিজ্ঞানী জন্মেছিলেন। তিনি মেঘনাথ সাহা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা তুমিই তো আমাকে বলেছো। আমাদের দেশে আরও কত বড় বড় কবি, সাহিত্যিক জন্মেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, তাঁদের দুঃখময় জীবন-কাহিনী আমি পড়েছি। তবে একথা ঠিক বাপ, অসহায়, দুর্ভাগা, শ্রমজীবী মানুষরাই চিরকাল বিশ্বের জ্ঞান-ভান্ডারকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানবার চেষ্টা করেছে। বিনীতা মন দিয়ে শোনে। মায়ের কথা ফুরায় না। বাড়ির দরজায় পৌঁছালো যখন, তখন পশ্চিমের আকাশ আবির রঙে ভরে গেছে।

কিছুদিনের মধ্যেই বর্ষা এল দেশে। অবিরাম ভারী বৃষ্টির ফলে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে। ভাগীরথীর জল কুল ছাপিয়ে উঠে এল পারে। মাটি ধ্বসে সূর্যদের টালির কাঁচা ঘরখানা ভেঙে পড়ে গেল। দোকানের মালপত্র সব নষ্ট হয়ে গেছে। খাতা-বইপত্রও সব ভিজে গেছে। কতক ছিঁড়েও গেছে। চোখে জল ধরে রাখতে পারে না সূর্য আর বিনীতা।

বাবা সব যন্ত্রণা বুকে পাথরচাপা দিয়ে ঘর মেরামতের চেষ্টা করছে। মা ছুটে গেল প্রধানের বাড়িতে, যদি এই দুর্দিনে কিছু সাহায্য ায়েরা যায়। কিন্তু প্রধান মুখের উপর বলে দিলেন, না না, কোনো সাহায্য করতে পারব না। মা কাকুতিমিনতি করে বলল, চাল-ডাল নাইবা দিলেন, যদি একখান ত্রিপল দেন, একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। সরকার কোন ত্রাণ পাঠায়নি। তোমাকে দেব কী করে? আপনার ভুসিমালের দোকানের সামনে দেখলাম ত্রিপল-ভর্তি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ওগুলো সরকারি ত্রিপল নয়, আমার ব্যবসার ত্রিপল। প্রধান সাহেব, আমার অনুরোধ, ওখান থেকেই একখান ধারে নাহয় দিন। দাম আমি পরে মিটিয়ে দেব। ভগবান আপনাকে অনেক দিয়েছেন। অধমকে এইটুকু নাহয় উপকারই করলেন। বলি, আমাকেই বা কে উপকার করে? আমার পাঁচ বিঘা জমির পাট জলের তলায় পচে যাচ্ছে। তাহলে ত্রিপল আপনি দেবেন না? না গো, ধারে আমি ব্যবসা করি না। কথার পৃষ্ঠে কথা তোলে মা, তাহলে শোনেন, বছর বছর ঘরের জন্য আপনার হাতে দরখাস্ত দিয়ে গেলাম। আজ অবধি আপনি আমাকে পাকা ঘর দিলেন না। অথচ পাকা ঘর আছে এমন কতজন দুই দু’বার ঘরের টাকা পেয়ে গেল। এ আপনার কেমন বিচার? ডাহা মিথ্যা কথা। জীবনে কোন অসৎ কাজ আমি করিনি। এই বলে প্রধান ঘরের ভেতর ঢুকে গেলেন। মনে ক্ষোভ-বিক্ষোভ, দুঃখ-ব্যথা নিয়ে বাড়ি ফিরে এল সূর্যর মা।

দিন ঠেকে থাকে না। দিন সাতেকের মধ্যে বাণের জল নেমে গেল। সূর্যদের মাথার উপর আবার বাঁশ-টালির কুঁড়েঘর মাথা উঁচু করে দাঁড়াল। পুরানো কিছু বই জোগাড় করে নিয়ে দৃঢ় মনোবল নিয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করল সূর্য আর বিনীতা, এবার পায়ে হেঁটে। বাবার যে আর পৌঁছে দেবার সময় হয় না। মানুষটা যে ভোর হতেই স্টেশনের দিকে রওনা হয়, ফেরে অনেক রাতে। মা-ও এখন নিয়ে আসতে পারে না। দুই ভাই-বোন হেঁটে হেঁটেই বাড়ি ফেরে।
বছর শেষে চূড়ান্ত পরীক্ষায় সূর্য এবারও প্রথম হয়েছে। বিনীতাও আগের মতোই দ্বিতীয়। বিদ্যালয়ের পরিচালন কমিটির প্রধান ওদের এই সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়ে অর্ধেক ফি মুকুব করে দিয়েছেন। শিক্ষক-শিক্ষিকারাও বই, খাতাপত্র কিনে দিয়েছেন।

প্রধানের মেয়ে, ডাক্তারের মেয়ে, এম.এল.এ’র ছেলেরা গাড়িতে করে স্কুলে যায়। একদিন বিনীতা জেদ করল, সেও গাড়িতে চেপে স্কুলে যাবে। বাড়াবাড়ি করছিল। মা ধৈর্য হারিয়ে মেয়ের গালে কষে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। অবুঝ মন কেঁদে কেঁদে ভাসালো। সূর্য বোনকে শান্ত করে, ওর হাত ধরে নিয়ে চলল স্কুলে। পথে বোনকে বোঝালো, যারা হাঁটে তাদের শরীর ভালো থাকে, হাত-পা শক্ত হয়। শরীর ভালো থাকলে পড়াশুনায় মন বসে। বিনীতার মুখে হাসি ফোটে। দাদা, হাত-পা শক্ত হলে বুঝি খেলাধুলায়ও পারদর্শী হয়? একদম ঠিক। একথা বৃথা যায়নি। কিছুদিনের মধ্যেই বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হল। দুই ভাই-বোন একশো ও দু’শো মিটার দৌড়ে প্রথম হয়েছে। পুরস্কার হাতে বাড়ি ফিরলে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে মা। ায়েরা অশ্রুধারায় সিক্ত হল বিনীতা। ও আর কখনও অবাধ্য হয়নি।

মা ধীরে ধীরে দোকানটা আবার সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বিপদ ছাড়ল না। কালবৈশাখীর ঝড়-জলে ভিজে বাবা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ল। ওষুধ কেনা, সংসার চালানো, সবই এখন ছোট্ট দোকানটার উপর। সূর্য মাকে বলল, মা, স্কুলের টিফিন আর দিও না। খিদে পায় না। বাড়িতে এসেই খাবো। তবুও মা দুটো করে বিস্কুট দিয়ে দেয়। এদিকে বাবার জ্বর সেরেও সারছে না। ডাক্তারবাবু কী সব পরীক্ষা করার কথা বলেছেন। ায়েরা কপালে হাত উঠল। সে-ও অসুস্থ হয়ে পড়ল। সূর্য মাকে সাহস যোগায়। পরদিন সকালে সে ায়েরা নিষেধ সত্ত্বেও মশলা-মুড়ির গোল টিনের বাক্সটা মাথায় নিয়ে চলল স্টেশনের দিকে। ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করতে লাগল দিনের পর দিন। বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যায়। তারপর আবার পড়াশোনাও চলে অনেক রাত পর্যন্ত। বিনীতাও বসে থাকে না। থালা-বাসন ায়েরা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ধুয়ে নিয়ে আসে। তারপর দাদার পাশে এসে পড়তে বসে। বেশ কিছুদিন পর এক শিক্ষক এলেন বাড়িতে খোঁজ নিতে। সব শুনে তিনি প্রচণ্ড ব্যথায় কাতর হলেন। বাবা ততদিনে খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আরও দু-তিনদিন পর থেকে সূর্য আর বিনীতা স্কুলে যেতে লাগল।

জ্যৈষ্ঠের শেষ দিকে প্রধানের বড় মেয়ের বিয়ে। গোটা চারেক বাড়ি ছাড়া সারা পাড়া নিমন্ত্রিত। বাদ পড়া বাড়িগুলোর মধ্যে সূর্যদের পরিবারও আছে। বিয়ের দিন ডিজে, ইংরেজি বাদ্য, সানাই বেজে উঠল। সূর্যাস্ত হতেই গোটা পাড়া জুড়ে আলোর ঝলকানি। ওদিকে দৃষ্টি না দিয়ে সূর্য পূর্ব দিকের বারান্দায় বই নিয়ে পড়তে বসল। যদিও শব্দের দৌরাত্ম্য আর চলমান অতিথিদের কলকোলাহলে মনঃসংযোগ ঘটাতে পারছিল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে, আভিজাত্যের অহংকার কত-না সুন্দর হতে পারে, মনে মনে ভাবছিল। এমনসময় এম.এল.এ’র ছেলেরা রাজকীয় সাজ-পোশাকে বিয়ে-বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ বড় ছেলে ‘সম্রাট’ সূর্যকে দেখে থমকে দাঁড়াল। শ্রেণিতে কোনদিন বিত্তবানদের ছেলেমেয়েদের সাথে সূর্যর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। কিন্তু সম্রাট মাঝেমধ্যে কঠিন কোন অংক সূর্যর কাছেই বুঝে নিত। আর নিজের প্রয়োজনে সূর্যর সাথে উপর উপর ভাব রাখত। আজও সম্রাট সেই ভাব বজায় রাখতে হাসিমুখে এগিয়ে এল জানালার কাছে। বলল, কীরে সূর্য, যাবি না বিয়ে বাড়ি? চল্! সূর্য এক চিলতে নির্মল হাসি হেসে সম্রাটের মুখপানে তাকিয়ে রইল। আবার প্রশ্ন, কীরে, উত্তর দিলি না? সূর্য উত্তর দিল, না রে, তোরা যা। কেন রে, তোদের নেমন্তন্ন করেনি বুঝি? সূর্য আবারও মিষ্টি হেসে নীরব রইল। সম্রাট অর্থটা বুঝতে পারল। তবু বোঝাতে লাগল, তাতে কী হয়েছে? প্রধান সাহেবের ছোট মেয়ে আমাদের সহপাঠিনী। সেই হিসেবে তো যেতেই পারিস। না, পারিনা। বিনা নিমন্ত্রনে যাওয়াটা নীতিগতভাবে এক ধরনের অপরাধ। আচ্ছা, ছাড়্ ওসব নীতকথা। মেনুর কথা শুনেছিস্! সরষে ইলিশ, খাসির মাংস, পনির, রসমালাই, আইসক্রিম, আরও কত কী! ওঠ্, তোর বোনকেও নিয়ে চল্। মা আজ আলুসেদ্ধ ভাত করেছিল, আর তেঁতুলের চাটনি। খুব তৃপ্তি করে খেয়েছি। বোঝাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সম্রাট চলে গেল। পড়াশোনায় মন দিল সূর্য। মা আড়াল থেকে সব কথা শুনেছে। কাছে এসে ছেলের মাথায় হাত রেখে বলল, বাপ, তোর ভেতরে আমি আজ এক অন্য মানুষ দেখতে পেলাম। তুই সূর্যের মতোই আগুনে জ্বলে-পুড়ে একেবারেই খাঁটি সোনা। তোর ভেতরে কোন ময়লা, আবর্জনা ঠাঁই নিতে পারবে না। বড় মানুষ হওয়াই যেন তোর লক্ষ্য হয়। লেখাপড়া শিখে বড় পণ্ডিত হতে পারে অনেকেই, কিন্তু ক’জন বড় মানুষ হতে পারে? মা, আমাদের সমাজে এমন একজন মানুষ আছেন, যিঁনি একই সাথে বড় পন্ডিত আবার বড় মানুষও। তুমি নিশ্চয়ই তাঁর কথা জানো। বাপ, তাঁর কথাটা আমি তোর মুখেই শুনতে চাই। তিনি ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। আমি আশীর্বাদ করি, তুই যেন তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতে পারিস। ………।

ায়েরা আশীর্বাদে সূর্য একে একে সব ক্লাসেই প্রথম হয়েছে। এরপর জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা ‘মাধ্যমিক’ও দিল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। রেজাল্ট বেরোল যেদিন, বাড়িতে সাংবাদিক এল। জিজ্ঞেস করল, সূর্য, তুমি জানো, জেলায় তুমি প্রথম হয়েছো, রাজ্যে প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে একজন? জানি। এত ভাল রেজাল্টের পেছনে কী এমন যাদু ছিল? আমার পূজনীয় বাবা-মায়ের আশীর্বাদ, প্রেরণা এবং আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, আর আমার নিরলস পরিশ্রম। বড় হয়ে কী হতে চাও? জীবন প্রভাতে স্বপ্ন দেখতাম, আমি বড় বিজ্ঞানী হব। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে আমি এগিয়ে যাবো। আমার দৃঢ় অঙ্গীকার, আমি নিজেকে মানব সেবায় নিয়োজিত করে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালাব।

বছর পনেরো পরঃ

এই দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। ভাগীরথীর অনেক জল আঁকাবাঁকা পথ ধরে গড়িয়ে গেছে। এক বিকেলে বিনীতা কলেজ থেকে ফেরার পথে ধর্ষিতা ও খুন হয়েছে। শোকে-দুঃখে বাবা মারা গেল। বছর খানিকের মধ্যে মা-ও। উচ্চ শিক্ষার দ্বারে পৌঁছাতে ব্যর্থ সূর্য অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকের একটা চাকরি পেয়েছে। এখন স্ত্রী, আর মাস তিনেকের এক রতি মেয়েকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। কিন্তু তার মন বিষাদে, অবসাদে পরিপূর্ণ। গভীর রাত পর্যন্ত ঘুম ধরে না চোখে। শেষ রাতে চোখের পাতা বুঝে আসে। ঘুম ভাঙে অনেকটা বেলায়। এরপর স্কুল। পড়ন্ত বেলায় বাড়ি ফেরে। মেয়েকে একটুখানি আদর করেনা। দুঃখের স্মৃতিগুলো এসে ভিড় জমায় মনে। স্ত্রী সুমনা প্রগতিশীল স্কুল মাস্টারের মেয়ে। অতি আধুনিকতার জোয়ারে কখনো গা ভাসায়নি। যৌবনে প্রেমের দুর্নিবার হাতছানি নির্দ্বিধায় উপেক্ষা করেছে। বিয়ের পর ভেবেছিল সে তার সব ভালবাসা সূর্যকে বিলিয়ে দেবে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও পারেনি। ভয়ের ভাবনাগুলো এসে তাকে ঘিরে ধরেছে। মানুষটা সংসারের প্রতি এত নির্বিকার কেন? এত নিস্তেজ, একাকীত্ব, নির্জনপ্রিয়তা! মস্তিষ্ক বিকৃতি! তবে কি জীবনে বড় ভুল করে ফেললাম? এমন দুশ্চিন্তা তাকে যখন বড়ই অস্থির করে তুলল, হঠাৎ সেসময় একদিন এক বৃদ্ধা এলেন সূর্যর খোঁজ নিতে। তিনি একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শ্রীমতী বিমলা মজুমদার। এই বিদ্যালয় থেকেই তাঁর সময়ে সূর্য মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল। তিনি আবার সুমনার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়াও। সূর্যর বিয়ের পর এই তাঁর প্রথমবার আসা। তিনিই সুমনাকে সূর্যর অতীতের সব কথা খুলে বললেন। মনের যত কালিমা নিমেষে দূর হয়ে সুমনার হৃদয়-আকাশে ফাল্গুনের দখিনা বাতাস ঢেউ খেলতে লাগল।

একদিন হেমন্তের রাত বেশ গভীর হয়েছে। মানুষের কোলাহল থেমে গেছে। ঝিঁঝিরা অবিরাম ডেকে চলেছে। সুমনা অঙ্ক কষতে শুরু করেছে খাতায়। হঠাৎ একটা অঙ্ক আটকে গেল। মোবাইল ফোনে গণিতের ক্লাসের আলোচনা শুনেও সমাধান হল না। পাশে জেগে থাকা মানুষটাকে শুধোল, হ্যাঁগো, অংকটা তুমি পারবে? কী অংক, কেনই বা করছ? ভাবছি, এবার প্রাথমিকের নিয়োগ পরীক্ষায় বসব। আমি তো চাকরি করছি। তুমি আবার কেন? না না, চাকরি করতেই হবে, এমন কোন মনোভাব নেই। তাই বলে পরীক্ষা দিতে ক্ষতি কী? ওগো, দেখো না একটু! সূর্য এক ঝলক দেখেই পাটিগণিতের অংকটা মুখে মুখেই কষে দিল। ত্রিকোণমিতির একটা জটিল অংকও নিমেষে মুখে মুখে কষে দিল। ইংরেজির সিনোনিম, এন্টোনিম, বিজ্ঞানের জটিল প্রশ্নের উত্তরগুলো মুখস্থের মতো বলে দিল। সুমনা অবাক পলকহীন দৃষ্টিতে সূর্যর মুখপানে চেয়ে রইল। কী দেখছো? তোমার ভেতরের মানুষটাকে। নয়নাভিরাম মায়াময় সে দৃষ্টির বিছানো জালে সূর্য আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ল। এতদিন কাছে থেকেছে, দেখেছে, তবুও আজ বুঝি উভয়ে উভয়কে দেখল অন্য চোখে। এ দৃষ্টি অন্তরের, মধুময়, দুটি হৃদয়ের আঙিনায় যেন অতীব এক সুন্দর আলপনার ছবি এঁকে দিল। সুমনা বলল, তুমি অসাধারণ ছাত্র ছিলে, তাই না? ছিলাম, তবে আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি। ভাগ্য আমাকে অন্ধকারের পথে টেনে নিয়ে গেছে। সেই ভাগ্যের কথা একটু বলো না! শুনি। ভয় হয়। যদি আরও দুর্গম, দুঃসহ গাঢ় অন্ধকারে হারিয়ে যাই। ভয় পেয়োনা, এই সুমনা তোমাকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করবে, দু’হাত বাড়িয়ে আলোর পথে টেনে আনবে।

বলতে শুরু করল সূর্য। দু’চোখ জলে ভরে গেল। সুমনা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে দেয়। বলে, থাক্ তবে, কষ্ট হলে আর বলো না। আমি বিমলা পিসিমণির মুখে সব শুনেছি। তুমি ডাক্তারির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় চতুর্থ হয়েও ভর্তি হওনি। কেননা, তুমি বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন দেখেছিলে। তোমার সহপাঠীরা কেউ ডাক্তার হয়েছে, কেউ অধ্যাপক। চাইলে তুমি তাদের চেয়েও অনেক বড় ডাক্তার হতে পারতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অধ্যাপক হতে পারতে। হয়তো এই বঙ্গভূমি মেঘনাথ সাহার উত্তরসূরি আরেক বিজ্ঞানীর দেখা পেতে পারতো।

সূর্য অন্তর্দৃষ্টি মেলে দেখতে থাকে তার ফেলে আসা সোনালি দিনগুলোকে। সুমনা সান্ত্বনা দেয়, না হতে পেরেছো, তাতে কী হয়েছে? আর যা হয়েছো, সেও তো অনেক। তুমি তো মানুষ গড়ার কারিগর। তোমাকে একজন আদর্শ শিক্ষক হতে হবে। সমাজের মানুষ তোমাকে দেবতার আসনে বসাবে। এর চেয়ে মহীয়ান আর কী হতে পারে? সূর্যের যন্ত্রণাময় হৃদয়ে একটু শীতল ছোঁয়া লাগল। সুমনা হাসতে হাসতে বলে, অনেক কথা হল। এবার ভালো ছেলের মত ঘুমিয়ে পড় তো দেখি। নিদ্রা দেবী বোধ হয় একথা শুনতে পেলেন।

কালোমেঘে ঢাকা এক চাঁদনী রাতে উত্তরের হিমেল হাওয়া বইছিল। পাশে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট ফুলটুসিটা। সূর্যর দু’চোখের পাতাও বুঝে আসছিল। সুমনা বলে উঠল, না, আজ তোমার ঘুমানো চলবে না। আজ অনেক গল্প হবে। গল্প! হ্যাঁ গো, সে এক দুর্ভাগা জীবনের গল্প। আচ্ছা, বলোনা, সুজাতা তোমার এত কাছে এসেও দূরে সরে গেল কেন? সূর্য চমকে উঠল। কাঁপা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করল, বিমলা দিদিমণি এসব কথাও বুঝি তোমাকে বলেছে? কিছুটা। বলবেই না কেন? তাছাড়া এর মধ্যে খারাপের তো কিছু নেই। সূর্য তার হৃদয়কে দু’বাহু দিয়ে সজোরে চেপে ধরে বলে, সুমনা, জীবনের সেই কিছুটা সময়ে যা ঘটেছিল, তা আমার ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস। সুমনার জানবার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। সেই নির্মম স্মৃতি সূর্যর দু’চোখে ভেসে উঠল। ওগো, থামলে কেন? বলো না ! শুনি। আমি আর সুজাতা উচ্চমাধ্যমিকে একই নাম্বার পেয়ে যুগ্মভাবে রাজ্যে পঞ্চম হয়েছিলাম। তারপর বিএসসি অনার্স নিয়ে দু’জনই ভর্তি হয়েছিলাম একই কলেজে। ধীরে ধীরে একে অপরের মন অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধাও পড়েছিল। ভালোই কাটছিল দিনগুলো।

কলেজে আমাদের মধ্যে কোনো কথা হতো না। যেটুকু যা, হতো বাইরে। একদিন হঠাৎ কলেজ থেকে ফেরার সময় সুজাতা আমার পথ আটকে দাঁড়াল। চেনা মুখ যেন বড় অচেনা হয়ে গেল। আমাকে বিশ্রীভাবে অপমান করতে লাগল। ছি! সূর্য, ছি! এতটা নিচে থেকে চাঁদ ধরতে চাইছো? আমি জানতে পারলাম, তোমরা তপশীলি সম্প্রদায়ভুক্ত। না না, এটা হয় না। আমার পরিবারও মেনে নেবে না। আমি ব্রাহ্মণ কন্যা। শুরুতেই পরিচয়টা দিলে ভালো করতে। ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে, আজকের পৃথিবীতে জাতপাত দিয়ে মানুষের বিচার হয় না। হয় তার রুচি, শিক্ষা, সংস্কৃতি দিয়ে। কিন্তু সুজাতা এক লহমায় সম্পর্কটা ভেঙে দিয়ে চলে গেল। আর কখনও দেখা হয়নি। ওর প্রতি রাগ হয়নি তোমার? কখনও ভাবোনি, যাকে তুমি পেলে না, তাকে অন্য কাউকেও পেতে দেবে না? কখনও ভাবিনি, মিথ্যে করে তা বলব না। কিন্তু যাকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছি, তার উপর নিষ্ঠুর হতে পারিনি। নিজেকে নিরন্তর বুঝিয়েছি, যে ভালবাসল না, জোর করে তার মন পাই কী করে? পোষ না মানা পাখিরে লোহার খাঁচাতেও ধরে রাখা যায় না। হৃদয়-খাঁচাতে তাকে ধরি কেমন করে? কিন্তু আমার মনের আকাশে ঝড় উঠল। সেই ঝড় আমাকে ধূলায় মিশিয়ে দিল। মনে হতে লাগল, পৃথিবীতে সবচেয়ে কুৎসিত আমি। সুমনা দু’চোখ মুছতে লাগল। সূর্য জানতে চাইল, সুমনা, এই অকৃতী অধম মানুষটার জন্য তোমার চোখে জল? ভাবছি, জাতের অহংকার কত নির্মম পরিণতি ডেকে আনতে পারে! একটা মধুর সম্পর্ক শুধু ভেঙে যাওয়াই নয়, সেই অহংকার একজন ব্যক্তির বরেণ্য মনীষীতে উপনীত হবার সম্ভাবনাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেছে। সুমনা, তুমি এই হতভাগ্যের পরিচয়, এতকিছু জেনেও তাকে ঘৃণা করছো না? না, বরং তার প্রতি আমার ভক্তি, শ্রদ্ধা শতগুণ বেড়ে গেল। তুমি মহান হৃদয়ের পবিত্র এক অসামান্য মানুষ। প্রস্ফুটিত সুন্দর রজনীগন্ধাকে তুমি শুধু দূর থেকে দেখেছো। তার সুবাস, সৌন্দর্যকে উপভোগ করার স্পৃহা তোমার ভেতরে কখনও জাগেনি। তাকে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ পর্যন্ত করোনি। উপরন্তু নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছো। তোমাকে ঘৃণা করবো কেন? তুমি আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়। সূর্য, বংশগতভাবে আমিও ব্রাহ্মণ কন্যা। আমার বাবা অহংকারের পৈতা ধারণ করেন না। তিনি বলেন, পৈতা ধারণ করলেই বা ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম নিলেই ব্রাহ্মণ হয় না। জ্ঞানান্বেষণ,জ্ঞানদান এবং পবিত্র জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করেন। বাবার শিক্ষা আমিও পেয়েছি। সেই শিক্ষার আলোয় আজ আমি দেখতে পাচ্ছি, সুদূর অতীতে সমাজে প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মানুষের দ্বারা সৃষ্ট কুপ্রথার অভিশাপ আজও মোচন হয়নি। এ যে এক চির ব্যাধি, যার শিকার তুমিও। তোমার জীবন-আকাশ ঘন কুয়াশায় ভরে গেছে। তবু আমি বলব, আমি অমানিশার অন্ধকারে অনাদরে পড়ে থাকা এক টুকরো খাঁটি হীরের সন্ধান পেয়েছি। বিজ্ঞানী নাইবা হ’লে, ডাক্তার নাইবা হ’লে, অধ্যাপক নাইবা হ’লে, হয়তো জীবনের বাকি দিনগুলোয় সমাজের চোখে কালো হীরে হয়েই বিরাজ করবে। তবু তুমি দুঃখের এই সাগর পারে সুমনার চোখে চিরদিন জ্যোতির্ময় হয়ে থাকবে, চিরসাথী হয়ে।

রাত জাগা পাখি ডেকে ওঠে। যেন বলে, আমিও আছি তোমাদের সাথে। সুমনা অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের হাত বাড়িয়ে দেয় সূর্যর দিকে। বলে, আমাদের ফুলটুসি একদিন বড় হবে। ওকে আমরা মানুষের মতো মানুষ করব। নিশ্চয়ই ও তোমার অপূরিত স্বপ্ন পূর্ণ করবে। সূর্য চেয়ে চেয়ে দেখে, তার জীবন-আকাশ হতে কালো মেঘ সরে গিয়ে, শুক্লা তিথির এক ফালি চাঁদ উঠেছে।

……………………………………………………….