| উপন্যাস | পর্বঃষষ্ঠ |
| পরিযায়ীর সংসার | – হরবিলাস সরকার |
শোক-তাপ, দুঃখ-ব্যথা নিয়েই পরদিন সকালে কাজে গেল ফারহান। আবার সেই রাজমিস্ত্রির যোগানদারের কাজ। তবে করিম চাচা ফারহানকে এই অবস্থায় দেখতে চায় না। চাচার ইচ্ছা – ফারহান কাজ শিখে মিস্ত্রি হয়ে উঠুক। তাই ফাঁকে ফাঁকে হাতে ধরে ফারহানকে কাজ শেখাতে লাগল। ফারহানও আনন্দের সাথে একে একে সব কাজ বুঝে নিতে লাগল। আর মনে মনে ভাবতে লাগল, এমন লোকের সঙ্গ যদি আগে পেতাম!
কাল কাজে গেলে চাচা একটা ভালো খবর দিল, ফারহান, একটা বড় কাজের বরাত পেয়েছি গো। দোতলা বাড়ি হবে। মাস দু’য়েকের কাজ তো বটেই। কিন্তু আমি ভাবছি ওই কাজে তোমাকে দিয়ে ইট গাঁথাবো। আমি কি পারব, চাচা? পারতেই হবে। আর পারবে না কেন? আমি তো তোমার সঙ্গেই আছি। ফারহান উজ্জীবিত হয়।
দিন কয়েক পর, এক গভীর রাতে একদল মানুষ ফারহানের বাড়িতে হানা দিল। দরজায় ঘন ঘন টোকা মারতে লাগল। ঘুম ভেঙে গেল ফারহানের। ভয়ও ধরল তার মনে। বাইরে বেশ কয়েকজন মনে হচ্ছে। এরা কারা, কেনইবা এসেছে? আবারও টোকা। এবার বেশ জোরালো শব্দ। ভেতর থেকে ফারহান কাঁপা কাঁপা গলায় সাড়া দিল, কে? রবিউলের গলা – বড় ভাই, দরজা খুলো, কথা আছে। আলোটা জ্বেলে দরজা খুলল ফারহান। ভেতরে রবিউলসহ জনা পাঁচেক ঢুকে গেল। পাঁচজনের মধ্যে তিনজনকে ফারহান চেনে না। এরা আশেপাশের গাঁয়েরও নয়। এদের চোখের চাহনিতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ, যা ফারহানকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল। রবিউল বুঝতে পেরে বোঝাতে লাগল, ভয় নাই বড় ভাই। তবে বাঁচতে যদি চাও, আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে সত্যি কথা বুলেছিলা, তাছাড়া আমার ব্যাপারে যা যা জানো, সব ভুইলা যাও। কুনো কথা কাউকে বুলো না। যদি বুলো, তোমার দুটো বাচ্চা হারিয়েছো, এই দু’টোও হারাইবা, তুমি নিজেও মরবা। এই গেল প্রথম কথা। দ্বিতীয় কথা হল, কাল বিকাল চারটায় বল খেলার মাঠে দলের জনসভা। মঞ্চের উপর থেইকা তোমাকে যেন দেখতে পাই। চললাম, মনে থাকে যেন।
রবিউল তার দলবল নিয়ে চলে গেলে ফারহান বেঘোরে দরজাটা বন্ধ করে, আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চা দুটোর বুকে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। একরাশ আতঙ্ক এসে যেন ঘিরে ধরল। এই বাচ্চা দুটোই এখন প্রাণের ধন। এদেরকেও হারালে সে যে আর বাঁচবে না। এমন দুশ্চিন্তায় ঘুম ধরে না চোখে। আজ রাতের গভীরে যা ঘটে গেল, পরদিন কাজে গিয়ে করিম চাচাকেও বলতে সাহস করল না ফারহান। তবে প্রশ্ন করল, চাচা, রাজনীতি খুব খারাপ, তাই নয়? ইট গাঁথতে গাঁথতে চাচা উত্তর দেয়, তুমি কোন্ রাজনীতির কথা বুলছো, আমি জানিনা। রাজনীতির তো নানা রং থাকে। রং বলতে তুমি দলের কথা বুলছো তো? না ফারহান, দলের আদর্শ, সংস্কৃতির কথা বুলছি। একটা দলকে তার আদর্শ, সংস্কৃতি দিয়েই চেনা যায়, বোঝা যায় – সেই দল মানুষের অর্থাৎ সমাজের মঙ্গলের জন্য গড়ে উঠেছে কিনা। মঙ্গলের কথা তো সবাই বুলে। মঙ্গল বুলতে তুমি কী বুঝ, ফারহান? চাচা, মঙ্গল মানে তো মানুষের উপকার করা, মানুষকে সাহায্য করা। না। তাহলে কী? ধর, একজন সমাজবিরোধী বা খুনি ভোটে জিতে মানুষের প্রতিনিধি হয়ে গেল। সে দরদির বেশ ধইরা মানুষের সেবা কইরা বেড়ায়, আর গোপনে বা আড়ালে তার যেটা ধর্ম, সেটাই করে। তুমি তার বাইরেটা দেখছো, ভেতরটা দেখতে পাও না। আবার একজন নাম ডাকওয়ালা ধনী মানুষ যদি হাজার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, প্রলোভন দেখিয়ে ভোটে জিতে মন্ত্রী হন, তিনিও মানুষের কল্যাণ করেন না, যদি না তিনি বড় আদর্শ, বড় সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে গড়ে না উঠেন। বরং তিনি গরিবের সর্বস্ব লুটে নিয়ে আরও ধনী হয়ে উঠবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। আবার একজন সাধারণ বা অতি সাধারণ গরিব গোছের মানুষও যদি ভাগ্য বরাত মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান, তিনিও গরিবের দুঃখ-ব্যথা বোঝেন না। দীন-দুঃখীর দুঃখে চোখের জল ফেলতে ফেলতেই দীন-দুঃখীর কথা ভুলে যান। একদিন বড়লোক হয়ে ওঠেন। দামি গাড়িতে চড়েন। সুখের অট্টালিকা বানান। আসলে ত্যাগের আদর্শ না থাকলে এমনটাই হয়। এঁনারা এক একজন ভণ্ড পীর বাবা বা সাধু বাবার মতনই ছদ্মবেশী। ফারহান প্রশ্ন তুলল, চাচা, মানুষ কি নিজেরে পাল্টাতে পারে না? পারে ফারহান। কিন্তু সে বড় কঠিন কাজ। দস্যু রত্নাকর বাল্মীকি হয়েছিলেন, সেখানে ছিল এক দীর্ঘ জীবন সংগ্রামের ইতিহাস। মহান নেতাজি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। দেশ, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা না থাকলে তা সম্ভব ছিল না।
ইট গাঁথতে গাঁথতে ফারহান এবার বলে, চাচা, তুমি পাঁচটা গুনের কথা বুলেছো। বড় আদর্শ, বড় সংস্কৃতি, জীবন সংগ্রাম, মানুষকে ভালোবাসা আর ত্যাগের ধর্ম। এই সব গুণই তো গান্ধিজির মধ্যে ছিল। তাঁর মত নিয়ে চলা একটা দল এই দ্যাশকে বহুকাল শাসন করিছে, তবু আজও মানুষের এই হাল কেন? বাঃ ফারহান, বাঃ চমৎকার প্রশ্ন করিছো। বহুকাল শাসন করিছে বটে, কিন্তু শোষণ নামক জগদ্দল পাথরটাকে এক চুলও সরাতে পারেনি। আসলে কী জানো, গান্ধিজি একজন শ্রদ্ধেয় নমস্য ব্যক্তি, মহান উদার মনের বড় মানুষ। তা সত্ত্বেও একজন যত বড় মানুষই হোন না কেন, পথ যদি ভুল হয়, লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। মানুষের মুক্তিও অধরা থেকে যায়। চাচা, অহিংসার পথ – যা কিনা মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ ধর্ম, তা ভুল হইতে পারে? ফারহান বাপ, পথ বুলতে আমি অহিংসাকে বুঝাতে চাইনি। যে পথে মানব সমাজ বা সভ্যতার বিবর্তন ঘটে, আরও উন্নত সমাজ, উন্নত সভ্যতা আসে, আমি সেই পথের কথা বুলেছি। তাছাড়া এসব আমার কথা নয়, পৃথিবীর মাটিতেই জন্ম নেওয়া বড় মানুষদের কথা। ফারহান বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। করিম চাচা বলল, একটু থামো, বুলছি। চাচা এই সময় সুতো, ওলন ধরে দেখে নেয় – ফারহান ঠিকমতো ইট গাঁথতে পেরেছে কিনা। সব ঠিকঠাক আছে দেখে চাচার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, বেশ চমৎকার হয়েছে, খুব তাড়াতাড়ি তুমি মিস্ত্রি হয়ে উঠবে, ফারহান। ফারহানও হাসিমুখে বলে, চাচা গো, তোমার আশীর্বাদ মাথার উপর থাকলে নিশ্চয়ই মিস্তিরি হতে পারব। তবে এখনও আমাকে অনেক কিছু শিখতে হবে।
মাথার উপরে চৈত্রের গনগনে সূর্য যেন আগুন ঢালছে। দুটো মিনিটের জন্য ছায়ায় এসে বসে দুজনে। দুজন যোগানদারও একটু তফাতে বসে পড়েছে। মালিকের পক্ষ থেকে সবার জন্য চা বিস্কুটও এসে গেছে। এমন সময় দূরের মসজিদের আজানের ধ্বনি আকাশে-বাতাসে অনুরণিত হতে লাগল। হিন্দু মালিকের কর্মচারীকে যোগানদাররা জানিয়ে দিল, আমরা চা খাব না গো, রোজা আছে। কর্মচারী শুধোল, কীগো মিস্ত্রী, তোমরাও খাবে না? করিম চাচা হাত বাড়িয়ে দিল, আমাকে দাও। ফারহানও হাত বাড়ালো। চাচা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ফারহান, তুমিও রোজা করছ না? ফারহানের দু’চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। না চাচা, দেখতে দেখতে দুইটা বছর পার হয়ে গেল। মনে পড়ে – ইদে বাড়ি ফিরা আইছিলাম ভিন রাজ্য থেইকা। আনোয়ারা চইলা গেল। তারপর থেইকা মাথার উপর দিয়া আরও কত ঝড় বইয়া গেল! আল্লা দেখল কই? আমার নিষ্পাপ আফসানা বেটি, আরশাদ বেটা মইরা গেল! আল্লা বাঁচাইলো না। তাই তাঁরে আর ডাকিনা। যত শাস্তি হইল আমার। কিন্তু ওই শয়তান রবিউল – ওর কোন শাস্তি হইল না। উল্টে সরকারের থেইকা ক্ষতিপূরণ পাইল, নতুন করে কারখানা খুলল। চাচা ফারহানের ভেতরের দুঃখে বিগলিত হয়েও ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, চা-টা খেয়ে নাও ফারহান, কাজে লাগতে হবে। হ্যাঁ চাচা। চোখের জল মুছে নিয়ে ফারহান পাল্টা শুধোল, চাচা, তুমিও তো রোজা করো না। আল্লার নাম যদিওবা মুখে নাও কিন্তু মন থেইকা ডাকো না। ফারহান, তুমি আল্লাকে ডাকো না – তাঁর উপর অভিমান কইরা। আমি তাঁকে ডাকি না – পৃথিবীতে তাঁর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারি নাই বইলা। কিন্তু বাপ চারপাশে তোমার শত্রু। এবার তো মৌলবি ফরমান জারি করলে তোমাকে গ্রাম ছাড়তে হবে। ভয় আর পাই না। তা যদি করে, ঘরবাড়ি ছাইড়া চইলা যাব। তবে বুলোতো চাচা, তোমাদের গ্রামে তুমি আছো কেমন কইরা? অত্যাচার আমাকেও সইতে হয়েছে দিনের পর দিন। একদিন গ্রামে মাথাওয়ালারা বিচারসভা ডাকল। মৌলবি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নমাজ পড়না, রোজা করোনা কেন? উত্তরে আমি বুললাম, আল্লার প্রতি আমার বিন্দুমাত্রও অশ্রদ্ধা নাই। তবে নিরাকার আল্লা আছেন মানুষের ভক্তিতে, বিশ্বাসে। আজ অবধি বাস্তবে তাঁর অস্তিত্ব কেউ প্রমাণ করতে পারে নাই। পারে নাই বইলাই – যুক্তি, বিজ্ঞানের আলোকে ভক্তি, বিশ্বাস সব হারিয়ে যায়। অন্ধভক্তি, অন্ধবিশ্বাস মনকে গ্রাস কইরা নেয়। তাছাড়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলে বিশেষ নিয়মে। তা হল বিজ্ঞান। …….। যুক্তি-তর্কে ওঁনারা আমার সাথে পাইরা ওঠেনি। এখন অবশ্য আর জোর-জুলুম করে না।
ফারহান বলে উঠল, চাচা, এসব জ্ঞানের কথা এখন থাক্। ছোট মাথায় এত কথা একসঙ্গে ঢুকবে না। একদিন তোমার বাড়ি গিয়া সব শুনবো। চলো, কাজে লাইগা পড়ি। করিম চাচা হেসে বলল, মন্দ বুলোনি, কাজে ফাঁকি দেওয়া বড় অধর্ম।
গভীর মনোযোগে সবাই কাজ শুরু করে দিল। বেশ কিছুক্ষণ বাদে মালিক শশীকান্ত আচার্য এসে কাজ দেখতে লাগলেন। দেখতে দেখতে আপন মনে বললেন, বাঃ সুন্দর হয়েছে। করিম, তোমার আগে আরও দুজন মিস্ত্রি এসেছিল। ওদেরকে না দিয়ে কাজটা আমি তোমাকেই দিয়েছি, কেন জানো? শহরের নামকরা ইঞ্জিনিয়ার দেবীলাল বসাক একদিন এসে বললেন, আমি ইঞ্জিনিয়ার হলেও নির্মাণের ব্যাপারে আমার চাইতেও আব্দুল করিমের জ্ঞান অনেক বেশি, নিখুঁত কাজ। তাই আমি আর দ্বিমত করিনি। করিম চাচা হেসে বলল, দেবীলালবাবু আপনাকে এভাবে বুলেছেন! আমি তো ওঁনার কাছে অনেক কিছু শিখেছি। শশীকান্তও হেসে বললেন, বিষয়টা গুরু-শিষ্যের মতো। শিষ্য গুরুর কাছে শিখেই বড় হয়। ফারহান অবাক হয়ে শুনল কথাগুলো। তার নিজের ভেতরে এখন অনুপ্রেরণা তরঙ্গায়িত হতে লাগল।
বিকেল চারটায় কাজের ছুটি হলে ফারহান বলল, চাচা, আমি আর দেরি করবো না। একটু পা চালিয়ে হাঁটতে হবে। কেন গো, কোথায় যাবে? আমাদের গাঁয়ের বল খেলার মাঠে জনসভা আছে। আমাকে যেতেই হবে। কিছুক্ষণ থাইকা তারপর বাড়ি যাব। কাল রাতে রবিউল যেভাবে বইলা গেছে, তাতে …..। বুঝেছি, তোমাকে আর বুলতে হবে না। চাপো আমার সাইকেলের পেছনে। নেতাদের বক্তৃতা আমিও একটু শুইনা আসি।
ফারহান আর করিম চাচা যখন জনসভার মাঠে গিয়ে পৌঁছাল, ততক্ষণে সভা শুরু হয়ে গেছে। গোটা মাঠ লোকে থইথই করছে। রাস্তায়, আশেপাশের বাড়ির ছাদেও তিল ধারনের জায়গা নেই। ফারহান, করিম চাচা ভিড় ঠেলে মঞ্চের প্রায় কাছাকাছি গিয়ে হাজির হল। এমন সময় মঞ্চে বসা রবিউল উঠে মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়াল তার বক্তৃতা রাখতে। “আমার প্রিয় কাশেমপুরবাসী মানুষেরা, সকলকেই উপস্থিত হবার জন্য ধন্যবাদ। অন্তরের শ্রদ্ধা জানাচ্ছি আমার মায়েদের। তাঁদের স্নেহ-মমতা-ভালবাসায় আমি এই মাটিতেই জন্মে বড় হয়েছি। বিনিময়ে আমারও তো প্রতিদানে কিছু দেবার আছে। আমি আপনাদের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছি। আপনাদের চোখের জল আমাকে বড় কাঁদায়। ……..। মা-বোনেদের সম্মান রক্ষায় আমি নিজেকেও আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত। …….। অসহায়, গরিবের নিদারুণ যন্ত্রণা আমিও বুকে অনুভব করি। এই যে আমার সামনে আমার বড় ভাই ফারহান বসে আছে, ও বড়ই দুর্ভাগা। কিছুদিন আগে এক দুর্ঘটনায় ভাইজান ওর দুই ছেলেমেয়েকে হারিয়েছে।” বলতে বলতে রবিউলের চোখের জল দরদর বেগে ঝরে পড়তে লাগল। সেই জল মুছে নিয়ে আবার বলতে লাগল, “সেই দুঃসহ যন্ত্রণা আমার হৃদয়কেও কুরে কুরে খাচ্ছে। ……। দুর্ভাগা, অভাগার সব যন্ত্রণার নিরসন আমি করব, আমার প্রাণের বিনিময়ে হলেও। তবে একটা ছোট্ট অনুরোধ করব, আগামী সোমবার, আর মাত্র চার দিন বাকি, বিধানসভার ভোট, আপনারা সকলে প্রিয় জননেতা কাছের মানুষ মনিরুল সাহেবকে ভোট দিয়ে তাঁকে জয়যুক্ত করুন, আর আমার হাতকেও শক্তিশালী করুন, এই আশা রেখেই আমি আমার বক্তৃতা শেষ করছি। কাশেমপুরের মা-মাটি-মানুষ জিন্দাবাদ।”
সকলের করতালিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল। উৎফুল্ল জনতার কলরব ধ্বনিত হতে লাগল, রবিউল আল্লার বান্দা, মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। সহস্র কণ্ঠে স্লোগান উঠল, রবিউল ভাই জিন্দাবাদ। জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।
শুধু দুজন মানুষ নীরবতা পালন করছিল। একঃ ফারহান, অন্যজন করিম চাচা। এরপর মাইক্রোফোনের সামনে এলেন প্রার্থী মনিরুল সাহেব। সকলকে সালাম এবং নমস্কার জানিয়ে বলতে লাগলেন, “প্রিয় সুধীবৃন্দ, আমার জীবন আমি আপনাদের সেবায় উৎসর্গ করেছি। ……..। সর্বশক্তিমান আল্লা আমাকে আপনাদের সেবার জন্যই এই মাটিতে পাঠিয়েছেন। এখন আপনাদের সামনে আমার শপথ করার পালা। আমিও আপনাদের আশীর্বাদ পেয়ে ধন্য হব। জানি, আমার মুখ-নিঃসৃত শপথের বাণী শোনার জন্য আপনারা অধীর অপেক্ষায়। আর মাত্র চার দিন পর, সোমবার, আমিও প্রস্তুত এবং অপেক্ষায় রত সেই শুভ সময়ের জন্য, যখন আপনারা আপনাদের মূল্যবান ভোট আমাকে উপহার হিসেবে প্রদান করবেন। প্রার্থনা করি, হে আল্লা, আমাকে শক্তি দাও, সাহস দাও, বিপদে-আপদে আমি যেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি। …….। আমাকে সহনশীলতা দাও, আমি যেন দীন-দুঃখীর হৃদয়ের যন্ত্রণা ভাগ করে নিতে পারি। …..। ক্ষুধিতেের মুখে আমি আহার তুলে দেব। বঞ্চিতের শূন্য ঘর আমি ভরিয়ে দেব। মা-বোনেদের সম্মান বাঁচাতে আমি হব তাদের অগ্রদূত। আমি অন্ধকারে লক্ষ জোনাকি হয়ে আলো জ্বালব। …….। দুর্দিন সরিয়ে আমি সুদিনের আলোয় ভরিয়ে দেব। এই কাশেমপুরের মাটিতে গড়ে তুলব মানুষের বেহেস্ত। …..।”
আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে আবারও করতালি। মুহুর্মুহু স্লোগান, খোদার বান্দা মনিরুল সাহেব জিন্দাবাদ। জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ। এবারও ফারহান আর করিম চাচা নীরব। সূর্য অস্তরেখায়। চাচা বলল, ফারহান, বাড়ি যাও, আমিও চলি। ফারহান পিছু ডেকে জিজ্ঞেস করল, চাচা, কিছু বুললে না তো? চাচার মুখে ব্যঞ্জনার মৃদু হাসি। ফারহান, ওই ধপধপে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামার ভেতরে লুকিয়ে আছে রক্ত-মাংসের দানব। যারা করতালি দিয়ে আর জিন্দাবাদ বলে ওই দানবদের উচ্চাসনে বসানোর সম্মতি জানালো, আর নিজেদের ধন্য মনে করল, তারা আজ না বুঝলেও, আগামী দিন বুঝবে, ঐ মুখেই আক্ষেপ করে বুলবে, কী ভুল করেছিলাম! অবশ্য এদের আর দোষ কী? এরা বিভ্রান্ত, দিশেহারা। গভীর অন্ধকারে পথভ্রষ্ট। ফারহান প্রশ্ন করল, কে দেখাবে এদের আলোর পথ? চাচা মুখ ভার করে উত্তর দিল, আমার জানা নাই বাপ, স্বাধীনতার পর কী রাজ্যে, কী কেন্দ্রে একে একে অনেক দলই ক্ষমতায় আইল, কেউ কিচ্ছু করল না। মানুষগুলো আরও গভীর অন্ধকারে ডুইবা গেল। তবে এথাও ঠিক – অন্ধকার গুহার শেষে অবশ্যই আলোর দেখা মিলবে। সেই আলোর খোঁজে হয়তো আমাদের আরও দীর্ঘ পথ হাঁটতে হবে। ফারহান বলল, চাচা, তাই বইলা আমাদের দিগ্ভ্রান্তের মতো ভুল পথে হাঁটলে চলবি না। হয়তো আলোর পথ, কোনো আলোকবিন্দু আমাদের অতি কাছাকাছিই আছে, আমরা চিনেও চিনতে পারছি না নয়তো উপেক্ষা কইরা চলি। আমরা যেদিকে নিজ স্বার্থ দেখি, লোকবল দেখি, কোলাহল শুনি, সেদিকেই ছুটে চলি। চাচা ফারহানের কাঁধে হাত রেখে বলল, তুমি ঠিক কথা বুলেছো। আজ আমি তোমার কাছেও কিছু শিখলাম। যাও বাপ, এবার বাড়ি যাও। তোমার ছেলেমেয়েরা এতক্ষণে বুঝি পথের দিকে তাকিয়ে আছে। দেরি না করে দুজন দুজনের গন্তব্যের দিকে রওনা দিল।
সভার মাঠ খালি হতে লাগল। রাত নেমে এল পৃথিবীর উপর। একটু পর থেকেই শুরু হল বোমা-গুলির লড়াই। একে একে লাশ পড়ছে। ঠিক চার দিন পর, সোমবার, ভোটের দিন ঘনিয়ে এল। ভোর থেকে শুরু হয়েছে ভোট দান। একের পর এক মৃত্যুর খবরও আসছে। বোমা, গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বুথ দখল করে ছাপ্পা ভোট চলছে। পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ভুল পথে চালনা করা হচ্ছে। এভাবে সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে এল, ভোটদান শেষ হল। কোলাহল বন্ধ হয়ে নিস্তব্ধতায় ভরে উঠল। সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে চারদিকে স্বজন-হারাদের আর্তনাদ জোরালো হয়ে উঠল।
একদিন পর সকাল থেকে ভোট গণনা শুরু হল। সন্ধ্যায় গণনা শেষ হতেই মনিরুল মাস্টারের নামে জয়ধ্বনি উঠল। রবিউল, তার দলবল মেতে উঠল আবির খেলায়। রাতে ডিজে বাজিয়ে শুরু হল মদ-মাংসের মহোৎসব। এ যেন ঘোর কালো রাত। আর সেই রাত পোহাতেই নতুন বিপদ এসে হাজির হল ফারহানের দরজায়।
(ক্রমশঃ)
……………………………………………………