Porijayir Songshar – পরিযায়ীর সংসার | প্রথম পর্ব

উপন্যাস পর্বঃ এক
পরিযায়ীর সংসার  – হরবিলাস সরকার

ভোরে কাজের খোঁজে বেরিয়েছিল ফারহান। ঘন্টা দুই-তিনেক পরে শুকনো মুখে বাড়ি ফিরে এল যখন, দেখল,  ছেলেমেয়েগুলো খ্যান খ্যান করছে, আর বলছে, আম্মা খেতে দাও, প্যাটে ভুখ লাগছে। আনোয়ারা কী দেবে খেতে? মুড়ির কৌটোটা ঝাঁকায়। গতকাল পাঁচশো গ্রাম মুড়ি কিনেছিল। দু-চারটে মুড়ি কৌটোর তলায় পড়ে আছে। বাচ্চারা কৌটোটা খোলে। পড়ে থাকা মুড়ি ক’টাই এখন খুঁটে খুঁটে খেতে শুরু করেছে। দু’বছরের খুদে আরশাদ বুকের শুকনো দুধ টানছে আর বারবার কেঁদে উঠছে। আনোয়ারা ওর মাথায় হাত বুলায়। দুঃখ করে বলে, বেটা, দুধ তুই পাবি কী করে? ভালো-মন্দ কী খাই আমি? আরশাদের এক বছরের বড় সামাদ হাঁটি হাঁটি পা পা করে আব্বুর কাছে এসে দাঁড়ায়। তার মুখপানে তাকায়। চার বছরের রেহেনা আর পাঁচ বছরের আফসানা এবার কৌটোর তলায় জমে থাকা মুড়ির গুঁড়োগুলো আঙ্গুলে তুলে চেটে চেটে খেতে লাগল।

দুঃখের মধ্যে আনোয়ারা মেজাজ হারিয়ে ফেলে। কীগো, আজও তোমার কাজ জোটেনি? কোনো রাজমিস্তিরি তোমাকে কাজ দিল না? আজ চারদিন ধরে ঘুরে ঘুরে খালি হাতে ফিরা আসছো, আমি কী তুলে দিবো এদের মুখে? বুলতে বাধ্য হচ্ছি, বছর বছর জন্ম দিয়াছো, খাওয়ানোর কথা ভাবোনি? ফারহান বাচ্চাদের খিদের কষ্ট দেখে, তার উপর আনোয়ারার মুখঝামটা শুনে ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণায় জ্বলেপুড়েও মৃদু হাসল। বলল, আল্লার দান, মানুষের কি ফিরানোর সাধ্য আছে, বলো? আল্লার দান? আল্লাকে দোষ দিওনা। যাদের লালনপালনের ক্ষ্যামতা নাই, তাদের নিজেদের সংযম রাখা উচিত। গেরামের হাজি মোড়ল বড়লোক মানুষ, সে যদি চার-চারটে শাদি করে, আর ডজন খানিক জন্ম দেয়, তুমিও তাই করবা? ফারহান সুন্দরী আনোয়ারাকে ভালোবেসে শাদি করেছিল। তাই শত হলেও ওর প্রতি রুঢ় হতে পারে না। কড়া মেজাজ নির্দ্বিধায় হজম করে নিয়ে আবারও মিষ্টি হেসে বলে, জন্ম দিয়াছেন যিনি, আহার দিবেন তিনি। তোমার-আমার ভাবনার কিচ্ছু নাই। আনোয়ারা চুপ করে যায়। ভাবতে থাকে, আজ সকালে গেরামের মসজিদের মৌলবি এসেছিলেন বাড়িতে, আফসানাকে পাড়ার মাদ্রাসায় ভর্তি করিছি কিনা, জানতে। তিনিও তো আমাদের দুঃখের কাহিনি শুনে এই কথাই বুলে গেছেন। মৌলবি আল্লার দূত, মিছা বুলেননি। না না, আরশাদের আব্বাকে আর খারাপ কথা বুলা যাবে না। আল্লা অখুশি হলে বেহেস্তের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এতসব ভেবে আনোয়ারা বরং ফারহানের তপ্ত মাথায় জলের ছিটে দিতে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি হেসে বলল, ওগো, কী করবা এখন? সংসারটা তো চালাতে হবে। ফারহান রাঙা মুখের হাসিতে সব তিক্ততা নিমেষে মুছে ফেলে বলে, তুমি আমার পাশে আছো, চিন্তা কিসের! দেখো, সংসারের দুঃখ-কষ্টের মোচন আমি করে ফেলবোই।  মাথায় একটা উপায় ভেবে ফেলেছি। এছাড়া আর পথ নাই। এতদিন কতকিছু করলাম, কিছুতেই কিছু হয়নিকো। ভাঙরি মাল কেনা-বেচা করলাম, সংসার চালাতে পারলাম না। একশো দিনের কাজ করলাম, ঠিকমত টাকাপয়সা পেলাম না। এখন রাজমিস্তিরির জোগানদারের কাজ করছি, রোজ কাজ হয়না। খাবো কী? এর পরেও দু-তিন দিন কাজ না হলে অনাহারে মরতে হবে। এ বাংলায় কাজের বড় অভাব,  মজুরিও কম। কত আশা, স্বপ্ন বুকে বাইন্ধা তোমাকে শাদি করেছিলাম! ওগো, দুঃখের কথা মনে করলে দুঃখ আরও বাড়বে। ওসব ভুলে যাও। ওই যে বুললে না, কী একটা উপায় তোমার মাথায় এসেছে। বুলো না, শুনি! হ্যাঁ, আমাদের গেরামের সাইফুদ্দিন, আফতাব, জিনারুল, মইনুদ্দিন, আরও অনেকেই, কেউ দিল্লি, কেউ মুম্বাই, কেরালা, কেউ ব্যাঙ্গালোরে গেছে। শুনছি, ওসব জায়গায় কাজের অভাব নাই। মজুরিও অনেক বেশি। সে তো শুধু আমাদের গেরামেরই নয় গো, চারপাশের কত মানুষই তো কত জায়গায় যাচ্ছে। স্কুল-কলেজের পড়া ছাড়ান দিয়া ভবিষ্যতের কথা ভেবে ছেলেরা চলে যাচ্ছে। মেয়ে-বৌরাও যাচ্ছে। তো হ্যাঁগো, তুমিও কি যাবে? হ্যাঁ, যাবো ভেবেছি। কে তোমাকে নিয়া যাবে? আমাদের মেম্বর রবিউল, ওর ছোটো ভাই গো। ভিন রাজ্যের ঠিকাদারদের সাথে ওর যোগাযোগ আছে। আজই পথে দেখা হইছিল। আমাকে বুলেছে, বড় ভাই, তুমি রাজি থাকলে বুলো, তোমাকেও নিয়া যাবো। যাওয়ার খরচ নিয়া তোমাকে ভাবতে হবে না। পরে শোধ করে দিবা।

আনোয়ারার হাসি মুখখানা নিমেষে কালো হয়ে গেল। ফারহান বুঝায়, তুমি আমার জন্য মিছামিছি দুশ্চিন্তা করছো। পাঁচ-ছ’মাস বাদে বাদে তো বাড়ি আসবো, মাসে মাসে টাকা পাঠাবো, ফোনে ভিডিও কল করবো। চোখের সামনেই তো আমাকে দেখতে পাইবা। আর দেখবা, বছর খানেকের মধ্যেই সংসারের হাল ফিরা যাবে।

ফারহানের কথা শুনে আনোয়ারাও স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু ছেলেমেয়েরা খিদেয় বড্ড কাতর হয়ে পড়েছে দেখে আনোয়ারা বলে, ওগো, কিছু একটা ব্যবস্থা করো। আরশাদের জন্য এক পোয়া দুধ আনতে হবে। করিম ভাইয়ের দোকানে যাও। চাল, ডাল, আলু নিয়া আসো। এ মাস থেকে আমার একাউন্টে লক্ষ্মীর ভান্ডারের হাজার টাকা ঢুকবে। করিমকে বুলো, ধারের টাকাটা শীগগীরই শোধ করে দিবো। জানো আরশাদের বাপজান, এই দুর্দিনে সামান্য হলেও টাকা ক’টা অনেক উপকারে আসবে। ফারহান ঝোলা হাতে বেরিয়ে পড়ে।

আজ দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ফারহান, আনোয়ারা আবারও সুখ-দুঃখের অনেক গল্পকথা জুড়ে দিল। ওগো, আরশাদের আব্বা, রাত পোহালে মাঘ মাস। মাঘের শীত বাঘের গায়ে। ছেলেমেয়েগুলো শীতে কষ্ট পাচ্ছে। খড়-কুটা জ্বালিয়ে আগুন পোহায়। ওদের জন্য শীতের পোশাক কিনতে হবে। ও ভালো কথা, পঞ্চায়েত অফিসে  তোমাকে একবার যেতে হবে। স্বাস্থ্যসাথী কার্ডখান আনতে হবে। হ্যাঁ আনোয়ারা, যাবো। কাল তো রেশনও দিবে। রেশনটা তুলে এনে পঞ্চায়েতে যাবো। আবাসের তালিকার খোঁজটাও নিবো, আমাদের নামটা পাকা হল কিনা। মেলা ক’দিন আগে রবিউল একটা কথা বুলেছিল। কী কথা? বুলেছিল, বড় ভাই, হাজার তিরিশেক টাকা লাগবে। যদি পারো দিতে, তোমার নাম পাকাপাকি হয়ে যাবে, আমি কথা দিলাম। ফারহানের মুখে এমন কথা শুনে আনোয়ারা কপালে হাত দিল। তবু পাঁকা ঘর হাতছাড়া হবার ভয়ে মনকে শান্ত করে নিয়ে বলল, ওগো, তুমি বুলবা, টাকা আমি দিবো, তবে এখন নয়, একাউন্টে টাকা ঢোকার পরে।

পরদিন ফারহান পঞ্চায়েত অফিসে গিয়ে রবিউলকে কথাটা বলবে ভেবেছিল, কিন্তু তার আগেই জানতে পারল, আবাসের পাকা তালিকায় তার নাম নেই। নামটা কেটে রবিউলের ছোট বিবির নাম ঢোকানো হয়েছে। প্রধানকে নালিশ জানিয়েও কোনো লাভ হল না। কী করবে! বিষণ্ণ মনে স্বাস্থ্যসাথী কার্ডখান নিয়ে বাড়ি ফিরে এল সে।

কয়েকদিন পর মৌলবি আবারও দরজায় এসে হাঁক দিলেন। আনোয়ারা বেটি, বাড়ি আছো? হ্যাঁ মৌলবি সাহেব, আসেন।  শোনো, আফসানাকে প্রাইমারি ইস্কুলে ভর্তি করে দাও। দুপুরের খাওয়াটা পাবে। অসুবিধা নাই। সকালে মাদ্রাসা থেকে আসার পর স্কুলে পাঠিয়ে দিবা। পোশাক, জুতা, স্কলারশিপের টাকা পাবে। আপনার কথামতো মাদ্রাসায় ভর্তি করেছি। এখন আবার যখন বুলছেন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করতে, তো করবো। বুলছি কেন, শোনো, মাদ্রাসায় তো এইসব সুবিধাগুলো পাবে না।  কথা কী জানো, সরকার এখন আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকাচ্ছে। তাই সরকারের থেকে আমরা যেমন সুবিধা নেবো, আমাদেরও তেমনই সরকারের পাশে থাকতে হবে। হ্যাঁ, আমরা তো আছিই। তা মৌলবি সাহেব, একথা বুলতেই বুঝি আপনার আসা। এই দেখো, বুলতেই ভুলে গেছি। শুনলাম, ফারহান নাকি মুম্বাই যাচ্ছে? কী করবে ওখানে গিয়া, রাজমিস্তিরির জোগানদারের কাজ? হ্যাঁ, সেরকমই ইচ্ছা। ইচ্ছা যখন, যাক। আল্লা তোমাদের ভাল রাখুক।

মৌলবি চলে গেল। রাত নামতে বেশী দেরি নেই। আনোয়ারা পথচেয়ে বসে আছে, ফারহান কখন বাড়ি ফিরে আসবে। কত দিন পর আজ কাজে গেছে! সেই কোন্ সকালে শুকনা দুইখান রুটি খেয়ে গেছে! নিশ্চয়ই খুব খিদা পেয়েছে ওর। ……..।

একটু পরেই বাড়ি ফিরল ফারহান। লেবার খেটে পাঁচশো টাকা মজুরি পেয়েছিল। দুশো টাকা খরচ করে মিষ্টি আর ফল নিয়ে এসেছে। বাকি টাকা আনোয়ারার হাতে দিয়ে বলল, কালকের দিনটা চালিয়ে নিও। হঠাৎ মিষ্টি, ফল কিনে আনলে কেন? মুম্বাই যাবার দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। কাল বাদে পরশু। সকাল সাড়ে সাতটায় আজিমগঞ্জ জংশনে ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধরবো। হাওড়া নেমে ওইখান থেকে সোজা মুম্বাই।

আনোয়ারা খেতে দেয় ফারহানকে। মুখ লুকিয়ে আঁচলে চোখ মোছে। ফারহানের চোখ এড়ায় না। সান্ত্বনা দেয়, কাইন্দোনা, ইদের সময় বাড়ি আসবো। ছেলেমেয়েদের দেখিও। আর শোনো, করিম ভাইকে বুলে দিয়াছি, মালপত্র যা যা লাগবে, ওর দোকান থেকে নিয়া নিও। টাকা আমি ফোনে পাঠিয়ে দিবো।

রাত পেরিয়ে দিন। দিন পেরিয়ে একটা মাত্র রাত। সেই রাত কাটল অনেক কষ্টে। ছেলেমেয়েদের একে একে দু’হাত ভরে আদর করল ফারহান। আনোয়ারার চোখ মোছাতে মোছাতে বলল, যাত্রাকালে কাইন্দোনা। তারপর ধীরে ধীরে রওনা দিল স্টেশনের দিকে।

(ক্রমশঃ)

……………………………………………………..