| উপন্যাস | পর্বঃচতুর্থ |
| পরিযায়ীর সংসার | – হরবিলাস সরকার |
বল খেলার মাঠের দক্ষিণ ধার ঘেঁষে রাস্তা গেছে জাতীয় সড়কের দিকে। সে রাস্তার পাশে রবিউলের নবনির্মিত তিনতলা বাড়ির নিচে বাজি-ফটকার কারখানা। বেশ কয়েকজন কাজ করে। তাদের সংগে ফারহানও যোগ দিয়েছে। জনা তিনেক মহিলাও আছে। রাতে ওভারটাইম কাজ হয়। রবিউল মাঝেমধ্যে রাতের দিকে কারখানায় আসে। ম্যানেজার জাফরের সাথে কিছু কথাবার্তা আদান-প্রদান করে যত তাড়াতাড়ি পারে চলে যায়। বিশ্বস্ত জাফরই সব নিয়ন্ত্রণ করে।
ফারহানের কয়েক দিন সময় লাগল কাজটা শিখতে। এরপর থেকে তাকেও রাতে ওভারটাইম করতে বলা হল। রাতের কাজটা একটু অন্যরকম। ভেতরে কম আলো জ্বলে। দরজা-জানালা বন্ধ রাখা হয়। ফারহান লক্ষ্য করল, গোপন সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরের নিচে এক ঘর আছে, সেখান থেকে ভিন্ন রকমের মাল-মশলা আনা হয়। দক্ষ কারিগর মকবুল আর আকবর দুজনেই যুবক, ভিন রাজ্যে কাজে গিয়েছিল। রবিউল ওদের ফিরিয়ে এনে নিজের কারখানায় কাজ দিয়েছে। একজন ইঞ্জিনিয়ার, অন্যজন এইসব কেমিক্যাল নিয়েই পড়াশোনা করেছে। ওরা যেমন যেমন নির্দেশ দিচ্ছে, সবাই তেমনই কাজ করছে। ফারহান অবাক হয়, তবুও হুকুম পালন করে। কাজ করতে করতে তানজেরাকে চুপিসারে জিজ্ঞেস করে, বুহিন, রাতের বাজি-ফটকাগুলো এত বড় বড় কেন? বেশ সাবধানেও তৈরি করা হয়। লোহার কুচি, পাথর মেশানো হয়। তানজেরা মুখে আঙুল দিয়ে ইশারায় চুপ করতে বলে। তারপর কানে কানে বলে, রেতেরবেলা কথা বলা বারণ। শুধু ইশারায় কাজ করতে হয়। এগুলো বাজি-ফটকা লয় গো, বোম। বোম! হ্যাঁ, দেখছো না, প্রায়ই বাইরে থেকে মুখ ঢাকা লোক আসে। বড় বড় ঝোলা ভর্তি কইরা লিয়া যায়।
রুমেলা একটু গা-ঘেঁষা। মাস তিনেক আগে স্বামীহারা হয়েছে। ফারহান ওর কাছে জানতে চাইল, ছোট বুহিন, রেতেরবেলা লোক আসছে, এত এত মাল কিনে নিয়ে যাচ্ছে। কী করে ওরা এগুলো দিয়া? আরে ভাই, তুমি তো বড্ড বোকা মানুষ। রবিউল তো এই ব্যবসা করেই ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। বড় পাইকার আসে, ছোট পাইকার আসে, কেউ কেউ নিজের প্রয়োজনেও আসে। সামনে বিধানসভার ভোট। তারপরেই পঞ্চায়েত ভোট। বাংলাদেশে গন্ডগোল চলছে। এপার বাংলাও গরম হইয়া উঠিছে। বাজার এখন তুঙ্গে। মাল সাপ্লাই কইরা অবসর পাওয়া যাচ্ছে না।
জানতে জানতে, শুনতে শুনতে, আর দেখতে দেখতে ফারহানের কিছুটা গা-সওয়া হয়ে গেছে। আবার বড় বড় নোটের গন্ধ ভালোই লাগছে। কাজেও বেশ ওস্তাদ হয়ে উঠেছে। রহমান, হাবিব, বাক্কার, রমজানের থেকেও ফারহানকে বেশি প্রয়োজন এখন জাফরের। রবিউলের কাছেও ফারহান বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে।
একদিন রবিউল রাতে আলাদা করে জাফর আর ফারহানকে নিয়ে গোপন বৈঠকে বসল। রবিউল বলল, সামনে বিধানসভার নির্বাচন। উপর নেতৃত্বের কাছে একটা মোটা অংকের টাকা পৌঁছাতে হবে। আমি একটু অন্যরকম ভাবছি ফারহান ভাই। ফারহান বলে, দেখ রবিউল ভাই, তোমার ভাবনার উপরে আমার আর কিছু বুলবার নাই। জাফরও একই কথা বলল। রবিউল মুচকি হাসে। জানি, তাও শুনো তোমরা দুজনে। এবার নেতাদের ডিম্যান্ডের চেয়েও বেশি টাকা পাঠাব আমি। হাজি মোড়ল, জাবির যা পাঠাবে, তার চাইতে অনেক বেশি। হাজি মোড়লের টিকিট পাবার সম্ভাবনাটা প্রায় নিশ্চিত। ভোটে জিতে মন্ত্রী হওয়াটাও নিশ্চিত। মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পর ভাই জাবিরকে প্রধান বানাতে চেষ্টায় কোনো ফাঁক রাখবে না। কিন্তু আমি যে তা হতে দিব না। কেননা, তা হতে দিলে, ওদের হবে পৌষ মাস, আর আমার হবে সর্বনাশ। ব্লক সভাপতি মনিরুল মাস্টারের নামটা আমি প্রস্তাব আকারে পাঠাব। মাস্টার এম.এল.এ’র ভোটে জিতে গেলে সামনের বছর পঞ্চায়েত ভোটে জিতে আমার প্রধান হওয়াটা হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত হয়ে যাবে। হাজি মোড়ল আর জাবিরকে আটকাতেই হবে।
জাবিরের কথা শোনামাত্রই ফারহানের ভেতরটা গরম হয়ে উঠল। না রবিউল, জাবিরকে প্রধান হতে দেওয়া যাবে না। ও অনেক অন্যায় করিছে। জাফরও তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। বলল, হাজি মোড়লের ডান হাত, বাঁ হাত ওই জাবির। প্রধানের একটা সার্টিফিকেট আনতে গেলেও শয়তানটা হাত বাড়াইয়া টাকা লেয়। পাড়ার ঝামেলায় কেউ সালিশি সভা ডাকলে ও আগে হাজার টাকা জমা লিবে। জমিজমা নিয়ে বিবাদ বাঁধলে হাজির আগেই ও ব্যাটা দৌড়াবে। পাঁচ হাজার, দশ হাজার লিয়ে বিবাদ মেটাবে। আরে জাফর ভাই, এগুলা তো সামান্য ব্যাপার। রাস্তার দুই ধার দিয়া এক একখান দোকান বসাতে দু’-আড়াই লাখ করে লিচ্ছে। রবিউল উত্তেজিত হয়ে ওঠে। থামো ফারহান ভাই, সব আমি জানি। এই রবিউলকে তোমরা একবার প্রধান বানাও, দেখবা – যতরকমের ইনকামের রাস্তা, ফাঁকফোকর, সব আমাদের হাতে চলে আসবে। ফারহান বলে, কী করতে হবে রবিউল ভাই, বুলো কেনে একবার। জাফরও কথায় সায় দিয়ে বলে, এতদিন ওরা খেয়েছে, এবার আমরা খাবো। রবিউল ডান হাতের দু’আঙুলে গাল চিপতে চিপতে বলে, রুমেলাকে মাঝে মাঝে দুই ভাইয়ের কাছে পাঠাবো। ও ঘনিষ্ঠতা এমনভাবে বাড়াবে, যাতে ওদের গতিবিধি, পেটের খবর সব জানতে পারে। খবরগুলো আমার কানেও চলে আসবে। প্রয়োজন হলে দরজায় দু’চারটে ফটকা ছুঁড়ে আসতে হবে। তাতেও যদি হাজির টিকিট আটকাতে না পারি, ওর লাশ কবরে পাঠাবো। ডান, বাম, গেরুয়া, আর কেউ থাকবে না। শুধু রবিউলের সবুজ আবির উড়বে। এমনসময় কে একজন দরজায় খটখট করে বলে গেল, জাফর ভাই, বড় খদ্দের এসেছে। বৈঠক ভাঙে।
ইংরেজি নববর্ষের আর দিন কতক বাকি। একদিন সকালে সোফিয়া চাচি এসে আফসানাকে ডাকল। আফসানার পিছু পিছু রেহেনা, সামাদ, আরশাদও বেরিয়ে এল। আরশাদকে কোলে নিয়ে সোফিয়া আদর করতে লাগল। তুই তো বড় হয়ে গেছিস বেটা। হাঁটতে, দৌড়াতে শিখে গেছিস।
ফারহান ঘরেই ছিল। বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, কিছু বুলবে, বুহিন? সোফিয়া হিজাবটা তুলে মাথা, কপাল ঢেকে নিল। বলল, হ্যাঁ ভাইজান, ছেলেমেয়েদের এবার স্কুলে পাঠান। হ্যাঁ, পাঠাবো। ভালো কথা, তুমি তো বাচ্চাদের পড়াও। স্কুল থেকে ফিরা ওরা তোমার কাছে যাবে। ভালই তো। কিন্তু ভাইজান, দেরি কেন? আজ থেকেই যাবে। আফসানা, রেহেনা বেটি, তোমরা আজ থেকেই যেও। সামাদ, আরশাদ একা একা তো থাকতে পারবে না। ওদেরকেও নিয়ে যেও। ফারহান বলল, বুহিন, বুঝতেই তো পারছো, মা হারা ছেলেমেয়ে। তোমার কাছে গেলে লেখাপড়ার সাথে সাথে মায়ের আদরটুকুও পাবে। টাকা-পয়সার জন্য চিন্তা করবা না। সবার কাছে যা নাও, আমিও তাই দিব। না ভাইজান, আমি জানি – টাকা-পয়সার ব্যাপারে আপনাকে বুলতে হবে নাকো কিছু। তাছাড়া দেখছি তো, ছেলেমেয়েদের আপনি খুবই ভালোবাসেন। ওদের শীতের সোয়েটারগুলো বেশ ভালো হয়েছে। বেশ দামিও আছে, মনে হয়। সত্যিই সুন্দর হয়েছে। ফারহান ঊর্ধ্বপানে তাকিয়ে বলে, সবই আল্লার ইচ্ছা।
আজই একবার ফারহান স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাথে দেখা করল। স্কুল থেকে ফেরার সময় কী মনে হল, সে ঘুর পথে হাসিমুখে ভানু বিবির বাড়ি গিয়ে উঠল। ভানু বিবিও অবাক হয়ে হাসতে হাসতে বলতে লাগল, কীরে ফারহান, চেহারায় তো জৌলুষ ধরিছে। ভালোই আছিস দেখছি। মুম্বাই তাহলে আর যাচ্ছিস না? এখানে ভালো থাকলে যাবারইবা দরকার কি? তা ভালোই যখন আছিস, সংসারটা আবার নতুন করে পেতে নে। সে আর কতদিন তোর পথ চেয়ে বসে থাকবে? আজ বুবুর কথায় ফারহান হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। কিঞ্চিত লজ্জায় মুখ চেপে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। বুবুর ভেতরেও খুশির হাওয়া বইতে লাগল।
জানুয়ারির দুই তারিখ থেকে আফসানা তিন ভাই-বোনকে সাথে নিয়ে স্কুলে যেতে লাগল। বিকেলে সোফিয়া চাচির কাছেও নিয়মিত প্রাইভেট পড়তে যায়।
কয়েকদিন পর এল অমাবস্যা তিথি। রাতের গভীরে হাজি পার্টি অফিসে মিটিং শেষ করে এসে বাড়ি ঢুকছিল, ঠিক তখনই তাঁর বাড়ির দরজায় বোমা পড়ল। একটা নয়, পরপর অনেকগুলো। রাতের অন্ধকার, তার উপর কালো ধোঁয়ার জমাট অন্ধকারে বারুদের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। মরণ চিৎকার-ধ্বনিগুলো ক্ষণিকের জন্য শোরগোল তুলে মিলিয়ে গেল। বাড়ির লোকেরা বাইরে বেরিয়ে এল। আলো জ্বালানো হল।
বোমার বিকট শব্দ প্রতিবেশীদের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। আর্তনাদ শুনে একে একে তারা জড়ো হতে লাগল। তারা দেখল – প্রাণে বেঁচে গেলেও হাজির ডান পা-টা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাবিরের বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল উড়ে গেছে। ঘটনাস্থলে মারা গেছে আনসার, গোলাম, কাবিরুল। আহত আরও চারজন। ওরা সবাই দলের কর্মী। হাজি, জাবিরকে নিয়ে যাওয়া হল নার্সিংহোমে। খবর পেয়ে একটু বাদে পুলিশ এসে লাশগুলো তুলে নিয়ে গেল।
পরদিন সকালে রবিউলের নেতৃত্বে বিশাল মিছিল বের হল। নিজেই শ্লোগান তুলল, জনদরদি জননেতা হাজি মোড়ল জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ। আনসার, গোলাম, কাবিরুল অমর রহে, অমর রহে, অমর রহে। শহিদের রক্ত, হবে নাকো ব্যর্থ। ……..। গেরুয়া ধ্বজাধারী, গান্ধীবাদী, লাল পতাকা ধারীরাও মিছিল করল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার্থে। দুপুর গড়াতেই দেখা গেল গোঁড়া মুসলমানদের অস্ত্র মিছিল। অস্ত্রসহ ছোটরাও পা মেলাচ্ছিল। মিছিলের অগ্রভাগে বহিরাগত দু’জন জেহাদী নেতাকে লক্ষ্য করা গেল। জনবহুল চৌরাস্তার মোড়ে ওনারা বাংলা ভাষাতে বক্তৃতা করছিলেন। সামনের ফেস্টুনে লেখা ছিল – মুসলমান ভাইসব এক হও, ভারত উপমহাদেশ আমাদের, ইসলামের জয় সুনিশ্চিত।
রাত নামতেই শুরু হল হিন্দু-মুসলমানের বিধ্বংসী তাণ্ডব। উভয় পক্ষের বাড়িঘর দোকানপাট পুড়ে ছাই হল। মন্দির, মসজিদও রক্ষা পেল না। দু’জন নিরীহ হিন্দুকে কুপিয়ে খুন করা হল চোখের সামনে। মিলিটারিরা গুলি চালাতে বাধ্য হল। জানা গেল, গুলিতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন কিশোর,যুবক ও মধ্যবয়সী মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে।
নিশুতির প্রহরে ঐ দুই বহিরাগত জেহাদী নেতাকে রবিউলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে চাপতে দেখল গোয়েন্দারা। জানতে পারল, দু’জনেই বাংলাদেশের জেল পলাতক কুখ্যাত আসামি। একজন হাসান আলি, অন্যজন মীর জাহাঙ্গীর। পরদিন সকালে কাশেমপুর চৌরাস্তার মোড়ে মসজিদ সংলগ্ন বাজারে ফের তাণ্ডব। কারা এসে ঝাঁকে ঝাঁকে বোমা ছুঁড়ে পালিয়ে গেল, বোঝা যায়নি। জনা দশেক মুসলমান ধর্মাবলম্বী মানুষ ঘটনাস্থলেই ঝলসে গেছে। বারুদ আর রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। শকুনের দল উড়ছে আকাশে। আশেপাশের স্কুলগুলো খাঁ খাঁ করছে। আপাতত লেখাপড়া বন্ধ।
এই নৃশংস ঘটনার মধ্যেই খবর পাওয়া গেল, দিল্লিতে চার নির্মাণ শ্রমিক বহুতল থেকে পড়ে মারা গেছে। চারজনের একজন হিন্দু, বাকিরা মুসলমান। সকলেই মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা। কান্না আর শোকে বিহ্বল বিস্তীর্ণ এলাকা।
সপ্তাহ দু’এক বাদে পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত হয়েছে। জনজীবন স্বাভাবিক হয়েছে। হঠাৎ আবার কাশেমপুরের দুই পরিবারের দুই বিবির কান্নাকাটি শুরু হয়েছে। ওদের স্বামীরা মইনুদ্দিন আর কুতুবুদ্দিন ফারহানের সাথেই মুম্বাই গিয়েছিল। ওরা দুজনেই ওখানে শাদি করে নতুন সংসার পেতেছে। এখন এখানে টাকা না পাঠালে কী করে চলবে? রবিউল মেম্বর এসে দুই বিবিকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে শান্ত করল।
কয়েকদিন পর আবারও দুঃখের খবর এল কাশেমপুরে। কলকাতায় ডেকোরেটরের কাজে গিয়েছিল এলাকার হাসান আর ছোট ভাই বছর পনেরোর ফারুক। রাতে গোডাউনে শুয়ে থাকত নানা জেলা থেকে আসা আরও জনা পঁচিশেক শ্রমিকের সাথে। রাত দুপুরে বিধ্বংসী আগুন লেগে গোডাউন পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। কেউই আর বেঁচে নেই। নির্মম খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই শোকে স্তব্ধ গোটা কাশেমপুর।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ভীমেশ্বরের দেবেন একদিন পড়ন্ত বেলায় ফারহানের কাছে এসে দুঃখ প্রকাশ করল, ভাই দেশ ছেড়ে আমি চলে যাব। মনে আমার শান্তি নাই। কেন গো দেবেন দা? এখানে কোনো কাজ-কাম তেমন জুটছে না। তার উপর বড় অঘটন ঘটে গেছে আমার সংসারে। বড় ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। ছোট মেয়েটা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। গেল রাতে ওদের মা-ও জালাল খালির তোমাদের স্বজাতি চার ছেলের এক বাপকে বিয়ে করেছে। কী বলছো গো দেবেনদা! এই বয়সেও বৌদিদি ….. ! আমি ভাবি – আমাদের সমাজটাতে পচন ধরেছে। এখন তো দেখছি – তোমাদের সমাজেও পচন লেগেছে। তা কী করে এমন ঘটে গেল গো? ভাই, আজকাল পেটে খাবার না জুটলেও হাতে হাতে মোবাইল, ফেসবুকে বন্ধু জুটে যায়। প্রেম-ভালবাসায় মজতে কতক্ষণ! হ্যাঁ দাদা, এক্কেবারে খাঁটি কথা বুলেছো। কিন্তু এর চাইতেও বেশি খাঁটি হল – সবকিছুই বড্ড বেশি ঠুনকো। প্রেম-ভালোবাসায় জড়াতেও যেমন সময় লাগে না, ভাঙতেও তেমনই সময় লাগে না। সমাজটা একেবারে গোল্লায় চলে গেল। কেন এমন হল, বুলতে পারো দেবেনদা? আমাদের ছোট মাথা, ছোট বুদ্ধি, বলতে পারবোনা। তবে একটা কথা বলতে পারি, উপরে টাইনা তোলার লোক নাই। হ্যাঁ দাদা, ‘সুট,বুট,কোট’ পরা লোক আছে অনেক, ভণ্ড ফকির, সাধু-সন্ন্যাসী আছে অনেক, সাদা পোশাক পরা সমাজসেবীরা আছে, কিন্তু ভালো লোকের বড় অভাব। মাথার উপরে যাঁরা আছে, তারা গদি আঁকড়ে ধরে রাখতেই ব্যস্ত, নিজেদের আখের গুছাতেই ব্যস্ত।
দেবেন অস্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ফারহান ভাই, তুমি তো আর কাজের খোঁজে যাচ্ছো না, কী করছো তাহলে? তোমাকে দেখে তো মনে হয় ভালই আছো। ফারহান মনে মনে ভাবল, বন্ধু হোক আর যাই হোক, দেবেনদাকে আমার কাজের কথাটা বুলা যাবে না। কাজটা তো আর ভালো নয়। তার চেয়ে এইটুকু হীন মানসিকতার পরিচয় দেওয়াটা অনেক ভালো। তারপর একটু মুচকি হেসে বলল, কী আর করবো? রবিউল মেম্বরের জমিতে মুনিশ খাটছি। রেশনের চাল, আটা পাচ্ছি। ওতেই চলে যাচ্ছে। মুম্বাই যাবে নাকি আবার? গেলে আমাকে বলিও। দাদা, এখন যাচ্ছি না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ফেলে কী করে যাবো? তা তুমি যদি যাও, আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি। না ফারহান ভাই, তোমার সাথে যাবার ইচ্ছাটা ছিল। সেটা যখন হবে না, আমিও এখন যাবো না। এখানেই নাহয় মনমরা হয়ে বেঁচে থাকবো, যতদিন বেঁচে থাকা যায়।
দেবেন চলে গেলে ফারহান আপন কাজের জায়গায় রওনা দিল। আজ অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতে হবে। পথে রুমেলা আর তানজেরার সাথে দেখা। রুমেলা খোশ মেজাজেই ছিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে নিয়ে বলল, ফারহান ভাই, আজ ভালো খবর শুনতে পাইবা। হাজি আর জাবিরের খেলা শেষ। তানজেরা ধমক দিল, চুপ কর্, রাস্তায় কথা বুলা বারণ, জানিস না? রুমেলা ভুল স্বীকার করে বোরখায় মুখখানা ভালো করে ঢেকে নেয়।
কারখানায় পৌঁছালে রবিউল আজ সবাইকে ডেকে গোল মিটিং বসালো। খুশির খবরটা আগে দিল, উপরের নেতারা মনিরুল মাস্টার আর আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়েছেন। হাজি মোড়লের দিন শেষ। ভোটের টিকিট পেয়েছে মনিরুল মাস্টার। মাস্টার জিতে মন্ত্রী হবে। আর আমারও প্রধান হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু চুপ করে বসে থাকলে হবে না। সুযোগ পেলেই বিরোধীরা হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে পারে। দলের সুপ্রিমো আমাদের ন’টা বিধানসভার সবকটিতে জেতার জন্য কিছু রণকৌশল স্থির করে দিয়েছেন। সেই মতোই চলতে হবে। ওঁনারা সমস্ত ক্লাবগুলোকে এক লক্ষ করে, আর বুথগুলোকে দু’লক্ষ করে টাকা অনুদান দেবেন।
এমনসময় গেট পাহারাদার মুজিবর চাচা এসে খবর দিল, ইব্রাহিম আলি আর টারজান শেখ এসেছেন। ওনাদেরকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও, বলে রবিউল বাকি কথা দ্রুত শেষ করতে লাগল। আকবর, মকবুল, ফারহান ভাই, তোমরা তিনজনে মিলে কারখানার কাজকর্ম চালাও। জাফরকে বিহারে পাঠাচ্ছি। মাল-মশলা, আর কিছু ‘গান’ নিয়ে আসতে হবে। ঠিক আছে, এখন যাও, সবাই আপন আপন কাজে মন দাও। রুমেলা, তুমি একটু ক্যান্টিনে যাও, বিশেষ অতিথিরা এসেছেন। ওনাদের আর আমার জন্য তিন কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এসো।
সবাই বেরিয়ে গেলে ইব্রাহিম এবং টারজান ঢুকলেন ঘরে। সালাম আলাইকুম, রবিউল ভাই। আলাইকুম সালাম। রবিউল এরপর বিশেষ সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করে সম্মোধন জানাল, প্রোমোটার ইব্রাহিম, ল্যান্ড বিজনেসম্যান টারজান, আশা করি ভালই আছেন এবং ব্যবসা আপনাদের ভালই চলছে। হ্যাঁ, আপনাদের সাহচর্যে সবকিছু ভালোই চলছে। বাঃ শুনে আমার ভালো লাগল। আরও ভালো খবর দিচ্ছি, আপনাদের সাত কোটি আর বারো কোটি টাকার ঝামেলা মিটে গেছে। কোর্ট ক্লিন সীট দিয়ে দিয়েছে। ইব্রাহিম হেসে বললেন, এই কাজের জন্য মনিরুল সাহেব এবং আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। টারজান ভ্রু কুচকে মৃদু হেসে বললেন, পাবলিক আমাদের চিটার বলে। আচ্ছা বুলেন তো, দুর্নীতি কোন্ কালে ছিল না? দশ জনকে জমি বেচলে দুজনের টাকা ফ্রড করতেই হবে। এই যে এখন আমরা আপনাদের নির্বাচনে পাঁচ কোটি টাকা দিব, এটা আসবে কোত্থেকে? আর টাকা না দিলে আপনারা ভোটে জিতবেন কী করে? আদর্শের বীজ বুনে কি ভোটে জেতা যায় না নীতিবান হয়ে ব্যবসা করা যায়? হ্যাঁ, এটা ঠিক, আদর্শের বুলি আপনারা আওড়ান, আমরাও নীতিকথা আওড়াই। ওসব তো সাফল্যলাভের কলাকৌশল। রবিউল বিকৃত মুখ-হস্ত-ভঙ্গীমায় বুঝিয়ে দিল, ছাড়ুন ওসব, পাবলিকের আজেবাজে কথায় কান দিতে নাই। এরপর মুখ ফুটে বলল, চেক দুইখান দিয়ে যান, পার্টি-ফান্ডে জমা করে দিব।
চেক দু’খান দিয়ে আর রুমেলার হাতের কফি খেয়ে ইব্রাহিম এবং টারজান সাহেব উঠে পড়লেন। রসিকতা করে বলে ফেললেন, রবিউল ভাই, আমরা অন্ধকার জগতের লোক। বেশিক্ষণ এখানে থাকাটা কারও পক্ষেই মঙ্গল হবে না, চলি। রবিউল মুচকি হেসে বিদায় জানাল।
ফারহান আজ অনেক রাতে বাড়ি ফিরে ঢাকা দেওয়া খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘুম আসছে না চোখে। কত কী ভাবতে লাগল। অনেক অপরাধের সাক্ষী সে, অনেক অপরাধ ঘটাতে সহযোগিতা করেছে, তবু তার ভেতরের মানুষটা একেবারে মরে যায়নি। সেই মানুষটা যেন কাতর হয়ে বলছে আর সাবধান করছে, ফারহান, তুই এক ভয়ংকর চক্রব্যূহে ঢুকে পড়ে গেছিস। ওখান থেকে বের হতে না পারলে তোর মহা বিপদ। ফারহান উত্তর দেয়, একটু সুখ পেতে চাইছিলাম গো। তুই কি সত্যিই সুখ পাচ্ছিস? লোভ, ঐশ্বর্য, বৈভব জীবনকে সুখী করে না। কষ্টের হলেও ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেই আছে প্রকৃত সুখ।
ভোররাতে ঘুমের মধ্যে ফারহান স্বপ্ন দেখল – তার বাড়ি আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। চিৎকার করে গোঙাতে গোঙাতে জেগে উঠল ফারহান। আফসানা আব্বুর বুকে হাত বুলাতে বুলাতে শুধোয়, খারাপ স্বপ্ন দেখছিলে আব্বু? হ্যাঁ মা, খুব খারাপ স্বপ্ন। ঘুমিয়ে পড়, খারাপ স্বপ্ন কেটে যাবে। তাই যেন হয় মা, তাই যেন হয়। চোখ বন্ধ করে ফারহান।
অনেকটা বেলা হলে ঘুম থেকে উঠল ফারহান। একটু পরে মোসলেমা খালা এসে ফারহানকে ডাক দিল। খালা, তুমি হঠাৎ? এসেছি একটা খবর নিয়ে। আনোয়ারার ছেলে হয়েছে। কিন্তু বেটি যে ভীষণ কষ্টে আছে। বড়লোকের বিবি হয়েছে, তবে কষ্ট কেন? জাবির ওকে ছাড়তে চাইছে। তা আমি কী করব? শুনো বেটা ফারহান, জানোই তো – আমি জাবিরের বাড়ি কাজ করি। আনোয়ারা আমাকে ভোরবেলা কাঁদতে কাঁদতে বুলল, খালা, ছেলেমেয়েদের জন্য আমার খুব মন খারাপ করছে। ওদের আব্বুর জন্য মনে খুব কষ্ট পাচ্ছি। একথা তুমি নিজে গিয়ে ওকে বুলিও। তাই তোমাকে বুলতে এসেছি। সত্যিই বেটি আমার কষ্ট পাচ্ছে। জানতে চেয়েছে, তুমি ওকে ফের শাদি করবা কিনা। না খালা, তুমি ওকে বুইলা দিও, ফারহানের আনোয়ারা মরে গেছে।
এমন কথা শোনার পর মোসলেমা খালা আর কথা না বাড়িয়ে পেছন ঘুরে সোজা চলে গেল। কিন্তু যেকথা শুনিয়ে গেল, তাতে ফারহানের মন বিষন্নতায় ভরে উঠল। ফেলে আসা স্মৃতির পাতাগুলো একে একে ভেসে উঠতে লাগল চোখের সামনে।
(ক্রমশঃ)
……………………………………………………….