Eki Brinte Duti Kusum – একই বৃন্তে দুটি কুসুম

গল্প
একই বৃন্তে দুটি কুসুম  – হরবিলাস সরকার

অস্তবেলায় ও পাড়ার মসজিদে আজান শোনা গেল। রহিম আজ নমাজ পড়তে যায়নি। এসেছে এ পাড়ায় রামের বাড়ি, রামায়ণ গান শুনতে।

রাত নামল। গোটা বাড়ি বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করছে। উঠোনে শামিয়ানার নিচে বসে অধীর আগ্রহে রহিম দেখছে ‘রামের সীতা উদ্ধার’ পালা।

এমনসময় মৌলবী সাহেব পাড়ার দু’চারজন গোঁড়া মুসলমানকে নিয়ে সোজা এসে ঢুকলেন রামের বাড়ি। গায়ক হতভম্ব হয়ে গান থামিয়ে দিলেন। মৌলবী রহিমকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ধর্মকথা শুনতে এসেছ কেন? তুমি জানো, আল্লাহ্ তোমাকে ক্ষমা করবেন না! তোমার বেহেস্তে যাবার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

মৌলবী সাহেব, নমাজ তো রোজই পড়ি।  আজ বন্ধু আমাকে নিমন্ত্রণ করেছে। তাছাড়া রামায়ণ গান রোজ হবে না, শুনতেও আমার ভালো লাগে। তাইতো এখানে এসেছি। আর বেহেস্তের পথ, শুনেছি রামচন্দ্র সহায় থাকলে, বন্ধ হবে না।

রহিম, মুখ সামলে কথা বল। সবে তো বিএ পাস করেছো। ক’খান পুঁথি পড়ে সবজান্তা হয়ে গেছো দেখছি। না মৌলবী সাহেব, তবে এটুকু জেনেছি যে, যেখানে স্বর্গ, সেখানেই বেহেস্ত। শুধু নামের ফারাক।

গোঁড়াদের একজন মজিদ মোল্লা, মেজাজ দেখিয়ে বলল, মৌলবী আল্লার দূত। তুই ওঁনার সাথে এভাবে তর্ক করছিস? তোর ধড়ে ক’টা মাথা আছে রে? একজন হিন্দুর ছেলে তোর কী করে বন্ধু হয়? আর কোরানের কথা না শুনে রামায়ণের কথা শুনতে এসেছিস?

রহিম বেগতিক দেখে নীরবে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল। রাম কাছেই দাঁড়িয়েছিল। বিনম্র হয়ে শ্রদ্ধার সাথে বলল, হুজুর, আমরা একই গ্রামের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই বন্ধুত্ব। একসাথে খেলতে খেলতে বড় হয়েছি। সব সময় মনে হয়েছে একই মায়ের পেটের দু’ভাই। কে হিন্দু, কে মুসলমান আজও ভাবতে পারি না।

গোঁড়াদের আরেকজন রামকে ধমক দিয়ে বলল, চুপ কর্ হিন্দুর পো! জ্ঞান দিচ্ছিস? তোর বাপ কোথায়? রামের বাবা এগিয়ে এল। কী হয়েছে হামিদ ভাই? শোন নিত্যানন্দ, গ্রামে এসব চলবে না। এটা মুসলমানের গ্রাম। এখানে শুধু আজান শোনা যাবে। কী যে বল ভাই ! কত পুরুষ ধরে এই রামায়ণ গান হয়। এটা তো হিন্দুদেরই গ্রাম ছিল। আগে ছিল। এখন এটা নবীপুর। সে তো তোমরাই করেছ ভাই। করবো না কেন? সংখ্যায় আমরা তোমাদের তিনগুণ হয়ে গেছি। একদিন গোটা গ্রামটাই আমাদের হয়ে যাবে। রামায়ণ গান আজকের মতো বন্ধ হয়ে গেল।

মৌলবী এসময় ঊর্ধ্বপানে তাকিয়ে উপরওয়ালাকে স্মরণ করলেন। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’। পৃথিবীর মালিক একমাত্র আল্লাহ্।

রামের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গোঁড়া মুসলমানরা রহিমের বাড়িতে চড়াও হল। করিম ছেলের জন্য মৌলবীর হাতে-পায়ে ধরে বলল, আপনি ক্ষমা করে দিন। আল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, ছেলে আমার আর কোনদিন রামের বাড়ি যাবে না। করিম নত হওয়ায় মৌলবী খুশি হয়ে দলবল নিয়ে বিদায় নিলেন।

রহিম সত্যিই আর পশ্চিমমুখো হল না। রামের ভালো লাগছে না। এমনকি এ পাড়ার খেলার মাঠে যে রহিম বরাবর খেলতে আসতো, সে এখন ও পাড়ার মাঠে খেলতে যায়।

সামনে চৈত্রের মাঝামাঝি রামের জন্মদিন। রাম সব বাধা উপেক্ষা করে রহিমের বাড়ি এলো নিমন্ত্রণ করতে। শতবার অনুরোধ করে বলল, রহিম, প্রতিবার আমার জন্মদিনে গিয়ে কত আনন্দ করিস, এবারও যাস। রহিমের মুখে আজ আর খুশির হাসি নেই। একরাশ যন্ত্রণার হাসি হেসে বলল, পরিস্থিতি বদলে গেছে রে। রাম-রহিমের বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা আমাদের সমাজের মাথারা মেনে নিতে পারছেন না। তবে তুই আমাকে ভুল বুঝিস না। আমি না গেলেও মন আমার পৌঁছে যাবে। রহিমের মা-ও  রামের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করল না।

করিম কাজে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে নিমন্ত্রণের কথা জানল যখন, ভারাক্রান্ত মনে বলল, শিল্পী, দুই পরিবারের এতদিনের সম্পর্কের বাঁধন একটা দমকা হাওয়ায় ছিঁড়ে গেল। ওগো সেকথা ভেবে আমারও কি ভালো লাগছে? রহিম মনখারাপ করে  চুপচাপ বসে আছে। কী দিন এল! রহিমের বাপ, মন্দির-মসজিদে গিয়ে যে যার ধর্ম  করছে করুক, তাতে বাধা দেবার অধিকার আল্লা দেয়নি। এক ধর্মের মানুষের সাথে অন্য ধর্মের মানুষের মিলন হলে ক্ষতি কী? আমার বাপের বাড়ির গ্রামে পুজো-পরবে আমরা মুসলমান-হিন্দুরা মিলেমিশে এক হয়ে যেতাম। আমার ‘শিল্পী’ নামটা মা রেখেছিল। আজ যদি জেহাদিরা এসে বলে, শিল্পী হিন্দুগো নাম। ওই নাম পাল্টে দিয়ে মুসলমানের নাম রাখো। আমাকে তাই করতে হবে?

করিম কীসব ভাবতে ভাবতে বলে, এই নবীপুরের ইতিহাস তুমি জানো, শিল্পী? জানি  গো, জানি। তোমার বাবার মুখেই তো শুনেছি। এই গ্রামটার একসময় নাম ছিল নারায়ণপুর। পশ্চিমপাড়ায় ওই যে হিন্দুগো পাঁচশো বছরের পুরানো মন্দিরটা, ওর গায়ে নামটা এখনও লেখা আছে। ঠিকই শুনেছো। পুরানো লোকেরাও বলে, আমাদের পূর্বপুরুষরা হিন্দু ছিল।

একথা হাজারবার সত্য গো। আমার মা-ও বলে, তাদের আগের মানুষরা হিন্দু ছিল। সে কারণেই আমার মায়ের নাম সীমা। জানোতো, মা উঠোনে তুলসী গাছ লাগিয়েছে। আমিও এখানে লাগিয়েছি। এ পাড়ায় তো অনেকের বাড়িতেই তুলসী গাছ আছে। হিন্দু-বউরা শাখা-সিঁদুর পরে। কী ভালো লাগে! আমারও পরতে সাধ জাগে।

খবরদার! একথা মুখে আর কখনও এনোনা। বাতাসেরও কান আছে। গোঁড়াদের কানে গেলে পাড়া-ছাড়া করে দেবে। রামের জন্মদিনের নেমন্তন্ন ফিরিয়ে দিয়ে ভালোই করেছ। মনে যতই খারাপ লাগুক, সহ্য করে থাকো।

বিষন্নতায় দিন কাটতে কাটতে রামের জন্মদিন চলে এল। আড়ম্বর, জাঁকজমক নেই। দুপুর গড়িয়ে যেতেই অতিথিরা একে একে আসতে লাগল। রাম অপেক্ষা করছে প্রিয় বন্ধুর জন্য। বিকেল পেরিয়ে গেল। সূর্য অস্ত গেল। তাও রহিম, তার মা-বাবা কেউই এল না। রাত যখন এক প্রহর ছুঁই ছুঁই, রামের অস্থিরতা দেখে মায়েরও ভেতরটা শূন্যতায় ভরে উঠল। রহিমও যে তার আরেকটা ছেলে। শেষে এক বাটি পায়েস, গোটা কয়েক মিষ্টি নিয়ে চুপিচুপি মা-বেটা চলে গেল রহিমের বাড়ি।

রহিম রামকে জড়িয়ে ধরল। দুই মায়ের খালি বুক নিমেষে অসীম তৃপ্তিতে ভরে উঠল। করিমভাই চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, বৌদিমণি, দাদা এল না কেন? যাক ভালই হয়েছে না এসে। তোমরাও বেশিক্ষণ থেকো না। আমাদের উপর যা হয় হোক, তোমাদেরকে কেউ কিছু বললে সে অপমান আমরা সইতে পারব না।

রামের মায়ের গভীর নিঃশ্বাস পড়ে। ব্যথার কথাগুলো শত চেষ্টায়ও চেপে রাখতে পারল না। হ্যাঁ গো, অবুঝ মানুষগুলো বোঝেনা বলেই এক ভাই আরেক ভাইয়ের রক্ত নিয়ে হোলি খেলে।

শিল্পীও চুপ থাকতে পারল না। লক্ষ্মী বৌদিমণি, তুমি অনেক বড় কথা বলেছ। আমাদের গায়ের গোঁড়া লোকগুলোর চৈতন্যোদয় কে ঘটাবে? রহিম মায়ের কথাগুলো কেড়ে নিয়ে বলতে লাগল, মা গোঁড়ামি মানুষকে অন্ধ, অবুঝ করে দেয়। কে ওদের বোঝাবে যে, অতীতে কোন এক মায়ের কোলে যে দু’ভাই লালিত-পালিত হয়েছিল, একদিন তাদেরই একজন ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছিল। বংশানুক্রমে তারই উত্তর পুরুষ আমরা। রামও একই সুরে বলল, সেই আদিকাল থেকে বয়ে চলা একই নদীর জল আজ ভিন্ন ভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বইছে। কাকিমা, কিছু মানুষ জাতের নামে বজ্জাতি করে ভাঙন ধরাতে চায়। সত্যকে কিছুতেই মানতে চায় না। করিম সতর্ক করল, তোমরা আর একটি কথাও বলোনা। মনে হচ্ছে, কারা যেন আসছে। রাম মাকে নিয়ে দ্রুত অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

বিপদ তবুও এড়ানো গেলো না। পিছন থেকে তীব্র ঝাঁঝালো গলায় হাঁক দিল, এই তোমরা কারা? দাঁড়াও। রাম মাকে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঔদ্ধত্যের সাথে একদল মানুষ ছুটে এসে ঘিরে দাঁড়াল। কোথায় গেছিলে তোমরা? অন্ধকারে মুখগুলো চেনা না গেলেও বেশ বোঝা গেল, এ যে মজিদ মোল্লার গলা।

রাম মাকে হাতের স্পর্শে বলতে চাইল, ভয় পেয়ো না। তারপর নিজেই উত্তর দিল, মজিদ কাকা, আমরা করিম কাকার বাড়ি গেছিলাম। কেন, মানুষ কি মানুষের বাড়ি যায় না? কী বলে রে হিন্দুর ছেইলা? করিম,  আমি ওর কাকা? মার ব্যাটাকে।

হুকুম পালন করল দলের লোকেরা। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে মায়ের শরীরেও আঘাত লাগল। বাড়ি ফিরলে নিত্যানন্দ রামের ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে দেখে সেও সপাটে গালে দুটো চড় বসিয়ে দিয়ে বলল, এই আত্মীয়তা ঘুচুক চিরতরে। আঘাত তো আসলে লাগল মায়ের বুকে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, জন্মদিনে ছেলেটার গায়ে হাত তুললে! নিত্যানন্দ বুক চাপড়ে কেঁদে উঠে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল।

গভীর রাতে গোঁড়া মুসলমানরা জড়ো হল করিমের বাড়ির উঠোনে। লাঠির ঘায়ে তুলসী-বেদিটাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। দরজা লাথি মেরে ভাঙা হল। রহিম বাইরে বেরিয়ে এলে তাকে বেধড়ক মারা হল। করিমকে টেনে এনে কান ধরে ওঠবস করিয়ে ফতোয়া জারি করল, বাড়িতে হিন্দুদের কোন চিহ্ন থাকবে না। আর এই বলে শাসিয়ে গেল যে, না শোধরালে পরিণতি আরও ভয়ংকর হবে।

রমজান মাসের শেষে আকাশে এক চিলতে চাঁদ দেখা গেল। পবিত্র ঈদ এসেছে ঘরে ঘরে। তবে করিমের ঘরে খুশির হাওয়া নেই। প্রতিবার রামের পরিবার আসে। এবার ওদের নিমন্ত্রণ করা হয়নি। রহিম মন খারাপ করে বসে আছে। নতুন পোশাক পরেনি। মা সেমাইয়ের পায়েস করেছে। একটুকুও মুখে তোলেনি। দিদি আর বোন এসেছে বেড়াতে। তারাও বলে খাওয়াতে পারেনি। দিন শেষ হয়ে রাত নামে। মা ছেলেকে বলে, তোর ভালো লাগছে না, বুঝি। ওরে, আমারও কি ভালো লাগছে? রহিম মাকে বলে, হিন্দুরা কত উদার! সবাইকে  আপন করে নিতে পারে। মা বলে, কেন পারবে না? ওদের অন্তরে আছে রাম। কেন মা, রাম তো আমাদেরও! তাই যদি হবে, তবে মুখ ফুটে বলতে পারি কই? মায়ের  যন্ত্রণা জুড়াতে চায় রহিম। বলে,মা, ফের যদি তোমার কোলে জন্ম নিয়ে আসি, আমার নাম রেখো রাম। তা-ই রাখবো। আমিও আমার মাকে বলব, পরজন্মে সে যেন আমার নাম রাখে দুর্গা।…………।

নিস্তব্ধ রাতে রহিম মায়ের সাথে রামের বাড়ি আসে সেমাইয়ের পায়েস নিয়ে। রহিম কেঁদে ফেলে। ভাই রাম, মন চাইলেও নিমন্ত্রণ করতে পারিনি। রহিমের মা-ও চোখের জল মোছে। লক্ষ্মী প্রশ্ন করে, কেন এসেছ হিন্দুর বাড়িতে? দিদিগো, অভিমান করে দূরে সরিয়ে রেখো না। নিমেষে পাথরের বুকের আগুন নিভে যায়। সবার হৃদয়ের অন্তস্তলে এখন পরম শান্তি, স্বর্গীয় সুখ।

সুখ অবশ্য একটা রাতের বেশি রইল না। গুপ্তচরেরা ওত পেতেই ছিল। বিপদ ঘনিয়ে এল বিভীষিকার রূপ নিয়ে। ভোর হতেই মৌলবী এলেন দলবল নিয়ে। করিমের উঠোনে বিচার সভা বসল। নিত্যানন্দের পরিবারকেও ধরে আনা হল। মৌলবীর কঠোর হুকুমে কেটলি ভরে গোমাংসও আনা হল।

তারপরই বিচারের বাণী ধেয়ে এল। করিম, কাল নিশুতির অন্ধকারে তোমার ছেলে, বউ সেমাইয়ের পায়েস নিয়ে গিয়ে তোমাদের কুটুমদের খাইয়ে এসেছে। কিন্তু গোমাংস খাওয়ানো হয়নি। কেননা, গোমাংস তোমার বাড়িতে রান্না হয়নি। যাকগে, ব্যবস্থা আমরা করে ফেলেছি। তোমার ছেলে, বউকে এবার বল, এই সুস্বাদু গোমাংস কুটুমদের খাইয়ে দিতে। ওনারা সামনেই আছে। যদি খাওয়াতে না পারে, তাহলে তোমার স্ত্রী আর ছেলেকে চিরদিনের মতো এই নবীপুর ত্যাগ করতে হবে।

আজ অন্ততঃ একজনকে পাশে পেল করিম। গন্ডগোলের আঁচ পেয়ে ছুটে এসেছিলেন লতিফ মাস্টার। তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, মৌলবী সাহেব, এ কেমন বিচার? হিন্দু ধর্মের মানুষকে গোমাংস খাওয়ানোর নিদান! এ যে ভারী অন্যায়। আল্লার বিচারে আপনার জাহান্নামেও ঠাঁই হবে না। আর একটা কথা, একটি মুসলিম ও একটি হিন্দু পরিবারের মধ্যে মিলনের সম্পর্ক গড়ে উঠলে অপরাধ কোথায়? আমরা সকলেই ভারতীয়। এ তো সুমহান ভারতের সংস্কৃতি, পরম্পরা।

জনা কয়েক লতিফের মতকে সমর্থন জানালে দুপক্ষের মধ্যে তুমুল বচসা বেঁধে গেল। এই সুযোগে নিত্যানন্দ পরিবারকে নিয়ে পালিয়ে বাঁচলো। যত রাগ গিয়ে পড়ল লতিফ মাস্টার আর তার সমর্থকদের উপর। ওঁনাদেরকে বল প্রয়োগ করে তাড়িয়ে দেওয়া হল। শেষকালে করিম শাস্তি হিসেবে একশোবার কান ধরে ওঠবস করে বিচারের রায় মেনে নিয়ে বলল, আমি আমার স্ত্রীকে এক্ষুনি তালাক দিচ্ছি।

শিল্পী স্বামীর দুহাত ধরে চোখের জলে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে বলল, ওগো, এতদিনের সংসার, তুমি আমাকে তালাক দেবে! আমি স্বেচ্ছায় চলে যাচ্ছি। তৎক্ষণাৎ ছেলেকে নিয়ে সে এক কাপড়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে গেল। মেয়েরাও মায়ের পিছু ধরল।

বাড়িটা জনশূন্য হয়ে গেলে করিম অনন্ত আকাশের দিকে চেয়ে কেঁদে কেঁদে বলল, আল্লা, শিল্পীকে তুমি ভালো রেখো। দিনের শেষে সেও নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।

বেশ কয়েক মাস পর, রাম একদিন খবর পেল, রহিম গুরুতর অসুস্থ হয়ে জেলা হাসপাতালে ভর্তি আছে। মায়ের কাছে অনুমতি চাইল, মা, একবার গিয়ে দেখে আসব? অনুমতি মিলল না।

পরদিন আবারও কে একজন এসে খবর দিল, ছেলেটাকে রক্ত না দিলে বাঁচবে না। রক্তের বড় আকাল। রাম মাকে বোঝালো, মা, চিরশত্রুকেও মানুষ বিদায়বেলা চোখের দেখা দেখতে যায়। মায়ের পরানে বড় আঘাত এসে লাগল। চুপিচুপি দুজন রওনা দিল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।

সেখানে গিয়ে দেখল, রহিম মৃত্যুপথযাত্রী। নিদারুণ দুঃখভরা বুকে পাথর চাপা দিয়ে পাশে বসে আছে ওর মা। ডাক্তারবাবু আত্মীয়-স্বজনদের বললেন, একটু রক্ত পাওয়া গেলে আমি শেষ চেষ্টা করে দেখতাম।

রাম অস্থির হয়ে উঠল। ডাক্তারবাবু, আমার আর রহিমের শরীরে একই রক্ত, এবি নেগেটিভ। আমি ওকে রক্ত দেবো।

ডাক্তারবাবু এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল এক শরীর থেকে আরেক শরীরে। ঘুমন্ত প্রাণের স্পন্দন জাগরিত হয়ে উঠল। রহিমের মা ক্ষণিক পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর পুত্রসম রামকে প্রাণভরা আশীর্বাদ করে উচ্চস্বরে বলে উঠল, ঈশ্বর, তোমার অপার করুণায় ঘরে ঘরে যেন রামের মতো ছেলের জন্ম হয়।

…………………………………………………….