Porijayir Songshar – পরিযায়ীর সংসার | তৃতীয় পর্ব

 

উপন্যাস    পর্বঃ তিন
 পরিযায়ীর সংসার  – হরবিলাস সরকার

আনোয়ারাকে দেখতে না পেয়ে ফারহানের মনটা বিষন্নতায় ভরে উঠল। আফসানাকে জিজ্ঞেস করল, বেটি, তোমাদের আম্মা কোথায়? আফসানা কাঁদতে কাঁদতে বলল, জানিনা আব্বু, আম্মাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। ফারহান অতি দুঃখে অবলার মতো চুপ করে বসে রইল।

ভানু বিবি সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে ওঠে। ইদানিং শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণে বের হয়। হাইস্কুলের মাঠে গিয়ে বার তিনেক পাক দেয়। আজও তেমনই সূর্য ওঠার আগে প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়েছিল। ভোরের আলোয় চারদিক তখন বেশ আলোকিত হয়ে উঠেছে। মাঠে পাক দিতে দিতে দেখল, পাশের রাস্তা দিয়ে আনোয়ারা জাবিরের হাত ধরে চলে যাচ্ছে।

যা ঘটার তা ঘটে গেছে, একথা বুঝতে ভানু বিবির আর বাকি রইল না। কাল রাতে ফারহান বাড়ি ফিরেছে, সেকথাও তার কানে এসেছে। তাই মাঠ ছেড়ে সোজা সে চলে এল ফারহানের বাড়ি। গলা উঁচিয়ে হাঁক দিল, ফারহান… , ও ফারহান …. ,ঘর থেকে একটু বেরোও বেটা। আহত বুকটা দুহাতে চেপে ধরে বেরিয়ে এল ফারহান। জিজ্ঞেস করল, কেমন আছো, বুবু ? এই বয়সে ভালো আর কী করে থাকি, বেটা? তো বুলি, তোর ঘর যে ভেঙে গেছে, তুই কি খবর রাখিস? ফারহান কেঁদে ফেলে। বুবু সান্ত্বনা দেয়, কাঁদিস না। ওরে, ছেলেমেয়েদের তো মানুষ করতে হবে। এবার একটা ভালো মেয়ে দেখে তুইও শাদি করে নে। না বুবু, আমি তা পারব না। যে মন আনোয়ারাকে দিয়েছিলাম, তা আমি অন্য কাউকে দিতে পারব না। কথা শুনো বেটার, বুলি, যাকে এত ভালোবাসলি, সেই আনোয়ারা তোকে কী দিল? যা ভালো বুঝিস, তাই কর্, এই বলে ভানু বিবি চলে গেল।

বিকেলে আনোয়ারার ছোট বোন ‘সায়রা’ এসে আরশাদকে নিয়ে চলে গেল। পরদিন ভানু বিবি আবারও এল। ফারহানকে বোঝাল, তোর ছোট শালি খুব ভালো মেয়ে। দেখলি তো ওর ভেতরটা কেমন কাঁদছে। আরশাদকে আম্মার শূন্যতা বুঝতে দিল না। ওইটুকু ছেলেও কি আম্মা ছাড়া থাকতে পারে? আমিও যে তোর দুঃখ দেখে চুপ করে থাকতে পারি না। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তোকে বড় আপন বুইলা ভাবি। তোর আব্বা আমাকে বোহিন বুইলা ডাকত। আমিও ভাই ছাড়া কথা বুলতাম না। তুইও আমাকে নিজের মনে করে বুবু বুইলা ডাকিস। এ যে রক্তের সম্পর্কের থেকেও বড় রে। তাইতো বারবার না আইসা পারি না। এখন তুই যদি বুলিস, আমি শাদির কথাটা তুলতে পারি। না বুবু, তোমার সব কথা শুনব, কিন্তু শাদির ঝামেলায় আর জড়াবো  না। ভানু বিবি আজও ব্যর্থ হয়ে চলে গেল।

ফারহানের ভেতরটা রাগে-অনুরাগে জ্বলছিল। ক্ষতবিক্ষত মনটাকে কত করেইনা বোঝাতে লাগল, তুই ভুলে যা, যে তোকে ভুলে গেল। ওরে পাগল মন, দিনকাল বদলেছে, ভালবাসা আজ সুখের বড়ই কাঙাল, নদীর স্রোতের মতো বড়ই চঞ্চল, কলতান করতে করতে ছুটে চলে সাগরের পানে। সাগরের বুকেই বুঝি আছে সব সুখ। আমি তো আর সাগর নই, এক শুকিয়ে যাওয়া মরা নদী। আনোয়ারা ভালই করেছে চলে গিয়ে। আল্লা, ওকে তুমি সুখে রাখিও।

মনকে এত করে বুঝানো সত্ত্বেও চোখের উষ্ণ জলে মরা নদীতে বান এল। হৃদয়-আঙিনায় এতদিন ধরে যতন করা গোলাপটাকে ফারহান সেই বানের জলে চির বিসর্জন দিয়ে দিল। কিন্তু তপ্ত বুকের আগুনে সে যে জ্বলে-পুড়ে ছাই হতে লাগল। সে আগুন নিভেও নিভলনা, বরং দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। তার লেলিহান শিখায় সে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে জাবিরকে। আগে মহরমের দিন তাজিয়ার পেছন পেছন মিছিলে সে বের হতো যে তরোয়াল নিয়ে, সেই তরোয়াল নিয়ে  ছুটে গেল জাবিরের বাড়ির দিকে। জাবিরের লোকজন চারদিক থেকে ঘিরে ধরে উল্টে ফারহানকেই মারতে মারতে আধমরা করে ফেলল। তারপর আবার পুলিশ এসে দু’ঘা মেরে, কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় ধরে নিয়ে গেল।

নিদারুণ খবরটা পাশের গ্রাম সিরাজনগরে পৌঁছে গেল। সায়রা রুদ্ধশ্বাসে ছুটে এল। আজ ছেলেমেয়ে সবাইকে নিয়ে চলে গেল। ওদিকে খুনের চেষ্টার ধারায় মামলা রুজু হয়েছে আদালতে। বিচারক পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ফারহানের ষোল দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিলেন।

ভানু বিবি যন্ত্রণায় কাতর হয়ে উঠল। পরদিন সকালে টুকটুক ডেকে সোজা চলে গেল  সিরাজগরে সায়রার কাছে। সায়রাও আপ্যায়নের কোন ত্রুটি রাখল না। সায়রার আব্বু, আম্মা মেজ মেয়ের ব্যাপারে অনেক নিন্দা করল, আর ফারহানের জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করল। ভানু বিবিও দুঃখ প্রকাশ করে ভবিষ্যৎবাণী করে বসল, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে এভাবে চলে যেতে পারল আনোয়ারা? একদিন না একদিন এর শাস্তি ও পাবে। সায়রাকে বলল, বেটি তুই, হ্যাঁ তুই-ই এখন অনাথ ছেলেমেয়েগুলোর আম্মা, একথা ভুলিস না। ছেলেগুলো কাছেই ছিল। ওদেরকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল সায়রা।

তিন মাস জেল খাটার পর মুক্তি পেল ফারহান। বাড়ি ফিরে ছেলেমেয়েদের দেখবে, বড়ই ইচ্ছে করছে। দেখতে না পেয়ে ভানু বিবির বাড়ি গিয়ে উঠল। বুবু জানাল, তোর বাচ্চারা সায়রার কাছে ভালই আছে। আল্লার মেহেরবানি ওদের উপর আছে। বুবুর ঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে আধ বস্তার বেশি চাল রাখা আছে। বস্তাটা দেখিয়ে সে বলল, নিয়ে যা, তোর রেশনের চাল। সায়রা আমাকে কার্ডখান দিয়ে গেছিল। ডিলারকে বলে কয়ে সপ্তায় সপ্তায় চালটা আমি তুলে  রেখেছি। ফারহান মুখে না বললেও মনে মনে আল্লার কাছে বুবুর দীর্ঘায়ু এবং মঙ্গল কামনা করল। এরপর বুবুর বড় ছেলের বিবির হাতের তৈরি চা খেয়ে, চালের বস্তা মাথায় নিয়ে ফিরে এল ফারহান।

সেদিন, সূর্য পাঠে বসেছে, ঠিক তখনই, সায়রা এল ছেলেমেয়েদের নিয়ে। এতদিন পর কাছে পেয়ে ছেলেমেয়েরাও জড়িয়ে ধরল ওদের আব্বুকে। সায়রা আর দেরি করতে চাইল না। আম্মা বলে দিয়েছে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে। রাস্তাঘাটের পরিবেশ ভালো না। বেশি রাতে মেয়েদের যাতায়াত নিরাপদ নয়। টোটোও পাওয়া যাবে না। দুলাভাইয়ের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলল, রাখেন, না বুলবেন না। এসময় আপনার টাকাপয়সার দরকার। যেটুকু পারলাম, দিলাম। ছেলেমেয়েরা এখন কিছুদিন আব্বুর কাছেই থাকুক। ওদেরও  তাই ইচ্ছে। ফারহান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। সায়রাও রাত বাড়তে না দিয়ে বিদায় নিল।

আজকের রাত পোহালে মেম্বর রবিউল এল ফারহানের কাছে। তার উপর যা ঘটে গেছে, তা নিয়ে রবিউল দুঃখ প্রকাশ করল। ফারহানের আশ্চর্য লাগল। বলেই বসল, হাজি মোড়ল, জাবির, তোমরা তো একই দলের লোক গো। তোমরাই আমাকে মারধোর করলে, জেলও খাটালে। রবিউল ভুল ভাঙালো, নাগো, সেদিন আমি এলাকাতেই ছিলাম না। থাকলে কি এতটা হতে দিতাম? আমাকে ভুল বুঝিও না, ফারহান ভাই। শুন, তোমাকে বুলছি, ওই হাজি মোড়লকে আর প্রধান হতে দিচ্ছি না। প্রধান হব আমি। সামনে আবারও পঞ্চায়েত ভোট আসছে। শুনছি, এবার জাবিরও ভোটে দাঁড়াবে। ফারহানের ভেতরটা ভাবে-আবেগে একটু যেন বিগলিত হল। কী বুলছো রবিউল! তাহলে তো ভাইয়ে-ভাইয়ে লাঠালাঠি শুরু হবে। হবে কী, বিবাদ শুরু হয়ে গেছে। আমার সাথেও ঘোরতর বিবাদ বাঁধল বলে। নিজেদের মধ্যে এত কোন্দল থাকলে তুমি জিতবা কী করে? আরে ভাই, কোন্দল কোতি নাই, কোন দলে নাই? আছে তো, থাকলেও তোমাদের মধ্যে বেশি। তাহলে তুমিই বুলো,বেশি কেনইবা নয়? হাজি একাই সব খাবে, ভোগ করবে, জাবিরও ভাগ বসাবে, আর আমরা শুধুই বসে বসে দেখবো, তা তো হবে না। এই কারণেই তো কোন্দল বাঁধছে। আচ্ছা, তুমি নিচের তলার কথা ছেড়ে দাও, উপর তলায় কি কোন্দল নাই, বুলো? দেখতেই তো পাচ্ছো, খবরেও শুনতে পাচ্ছো, নেতায়-নেতায় লড়াই। এম.এল.এ, এম.পি’র ভোটে টিকিট পাওয়া নিয়ে মারামারি, খুনোখুনি। যে বেশি টাকা দিয়ে টিকিট কিনবে, লিস্টে তারই নাম উঠবে। তারপর মন্ত্রী হতে পারলে তো কেল্লাফতে। বলেই রবিউল গাল ভরে চাপা হাসি হেসে উঠল। ফারহান বলে, তোমার মুখের হাসিই বুঝিয়ে দিচ্ছে, তুমি এবার ভোটে জিতে প্রধান হইবাই। তোমারও তো লোকবল, টাকার বল কোনটাই কম নাই। এই অঞ্চলের দলের রাশ এখন তোমারই হাতে। সে যাইহোক, তো বুলো, তুমি আমার কাছে কি ভোট চাইতেই এসেছো? সে তো আমি আগেরবার তোমাকেই ভোট দিয়েছিলাম, এবারও দেবো কেনে। আরে না না ফারহান ভাই, ভোট চাইতে আসি নাই গো। এসেছি তোমাকে বুলতে যে, মেম্বর, প্রধান হয়ে শুধু আমরাই  ভালো থাকবো, তা তো হয় না। তোমাদের মতো গরিব, নিঃস্ব মানুষগুলোকেও দেখতে হবে। যারা আমার হয়ে খাটবে, আমাকে ভোট দিবে, বিনিময়ে তাদেরকেও কিছু দিবো। তা কী দিবা তুমি? এইতো পথে এসেছো। বুলি, তাহলে মন দিয়ে শুনো। চুপচুপ করে রবিউল বলল, কথাটা একটু গোপনীয়, পাঁচকান করিও না। তোমার জন্য ভালই হবে। হঠাৎ রবিউলের ফোনটা বেজে উঠল। ফোন ধরতেই হই-হট্টগোলের আওয়াজ শোনা গেল।  ফোনটা কেটে দিয়ে, এখনই আসছি বলে রবিউল উঠে পড়ল। বলল, বড় ভাই, আর্জেন্ট কল, গ্রামে আমাদের পার্টি অফিসে মারপিট বেঁধে গেছে। পরে এসে তোমাকে বুলবো। রবিউল গাড়ি স্টার্ট করেই গিয়ার বাড়িয়ে দিল। ফারহান ভাবতে লাগল, আবার কি কুনো বিপদ আমার জন্য অপেক্ষা করছে? না না,  আমি সাধারণ খেটে খাওয়া ছাপোষা মানুষ। আমার ওসব ঝামেলায় জড়াবার  দরকার নাই।

ক’দিন পর, ভোরবেলা, মৌলবি এলেন ফারহানের বাড়িতে। কথায় কথায় বললেন, ফারহান, তুমি আর ভিন রাজ্যে যেওনা। ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাংলাতেই থাকো। মৌলবি সাহেব, বুলছেন ঠিকই, আমারও তো দূরে যেতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু এখানে থেকে সংসার চালাবো কী করে? বেটা, তুমি কি শুনেছো, এ রাজ্যের সরকার শ্রমিকদের জন্য ভাতা চালু করেছে? মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেবে। ওই টাকায় কি আজকের দিনে সংসার চলে? এখানে নাই কুনো শিল্প, কলকারখানা। যা ছিল, তাও বন্ধ হয়ে পড়ে আছে, উঠে অন্য রাজ্যে চইলা যাচ্ছে। প্রতিদিন লেবারের কাজও হয় না। মজুরিও কম। মৌলবি এরপরও বললেন, মজুরি কম হলেও সরকার নানারকম সাহায্য করছেন। দিন তোমার চলে যাবে। তোমার যা পরিস্থিতি, তাতে তোমার পক্ষে নিজ-দেশে থাকাটাই শ্রেয়। ফারহান যুক্তি তুলল, আজ সাহায্য, ভাতা দিচ্ছে, কাল এই সরকার না থাকলে সব বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া এভাবে চলতে থাকলে, সরকারের কোষাগারও একদিন খালি হয়ে যাবে। আরে পাগল, না, তা হবে না। সরকার কি শুধু আমাদের ট্যাক্সের টাকার উপরই নির্ভর করে? কত দিক থেকে টাকা আসে, তা কি আমরা বুঝি না জানি? মনে কিছু করবেন না, মৌলবি সাহেব, ভুল হলে ক্ষমা করে দিবেন। ছোট মাথায়, ছোট জ্ঞানে বুলছি, আমার জীবন নাহয় চলেই গেল, কিন্তু আমার সামাদ, আরশাদের কী হবে? জীবনভর ওরাও কি  দয়ার দান নিতে হাত পাতবে? পরিশ্রম করে রোজগার করতে না পারলে জীবনের কুনো সার্থকতা নাই। জ্ঞানীরা বলেন, শ্রমের দ্বারাই তো সৃষ্টি হয়, দ্যাশের উন্নতি হয়। মাঠে মাঠে ফসল না ফললে সরকারের ভোটে জেতায় অসুবিধা হয় না, কিন্তু সাধারণ মানুষের  দুর্দিনের সীমা থাকে না। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর তৈরি না হলে কাজ সৃষ্টি হবে না। কারখানায় বস্ত্র উৎপাদন না হলে মানুষ তো আবার আদিম যুগে ফিরা যাবে। মৌলবি আর উত্তর দিতে না পেরে ফিরে গেলেন।

আজ বিকেলে ফারহান যাচ্ছিল ভানু বিবির বাড়ির পাশ দিয়ে। ভানুবিবি দেখতে পেয়ে পিছু ডাকল, ফারহান -, ও ফারহান -, বেটা, শুনে যাও একটু। ফারহান দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছন ঘুরে দু’পা এগিয়ে বলল, বুবু, ভীমেশ্বরে দেবেন মিস্তিরির বাড়ি যাচ্ছিলাম, কুনো কাজকাম আছে কিনা, খোঁজ নিতে। তা হেটে যাচ্ছিস? ওঃ হো, তোর তো সাইকেলও নাই। নাগো বুবু, হাঁটতে আমার ভালোই লাগে, মিনিট দশেক লাগবে। তো বুলো, ডাকলে কেনে। বাড়ির ভেতরে এসে একদণ্ড বস্, তবে তো বুলবো।

ফারহান ভেতরে গিয়ে বসল। ভানু বিবি আবার সায়রার সাথে সেই শাদির কথা তুলল, বেটা রে, তোর মঙ্গলই হবে। আট কেলাস অবধি পড়া-লেখা জানা মেয়ে, সে কি বসে বসে খাবে? গ্রামের ছোট ছোট ছেলেদের পড়াবে। দরকার হলে বিড়িও বাঁধবে। বিড়ি বাঁধার কথা শুনে ফারহান চমকে উঠল। ভানু বিবি বুঝতে পেরে বোঝাতে লাগল, নারে, ভয় পাস না।  আনোয়ারা যা করিছে, সব মেয়ে কি তাই করবে? সায়রা তোকে মনে মনে ভালোবেসেও ফেলেছে। ষোলো বছর বয়স। ওর আপার থেকে বারো বছরের ছোট। তোর বোধহয় ঊনচল্লিশ-চল্লিশ। বয়সের একটু বেশি ফারাক হলেও ক্ষতি নাই। ফারহান মনে মনে ভাবতে লাগল, ভালোতো আমাকে আনোয়ারাও বেসেছিল। কারও মনের খবর বাইরে থেকে জানা কি সম্ভব? দিনকাল যা পড়িছে, মন বদলাতে কতক্ষণ? ভানু বিবি জিজ্ঞেস করল, কীরে, চুপ করে কী ভাবছিস? বুল কিছু। বুবু, আমি আর নতুন করে সংসার পাততে চাই না। তাছাড়া সায়রারও ভবিষ্যৎ আছে। ও ছেলেপুলে চাইবে, এই বলে ফারহান উঠে পড়ল। ভানু বিবি চুপ করে ভাবতে লাগল।

দেবেন মিস্ত্রির সঙ্গে দেখা করে ফারহান বাড়ি ফিরল যখন, তখন রাত নেমে এসেছে। আফসানা বলল, আব্বু, ভাত বসিয়ে দিবো? আমি ঠিক পারবো রান্না করতে। ফারহান আনন্দে বিহ্বল হয়ে উঠল। আমার আফসানা মা বড় হয়ে গেছে, আমার আর কষ্ট কীসের? পরক্ষণেই বলল, না মা, তুমি এখনও ছোট আছো। ভাত আমিই রান্ধবো। তোমাদের নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। আরশাদ বেটার দুধটাও গরম করতে হবে। রেহেনা, সামাদ আব্বুর আদর খাওয়ার জন্য কাছে এসে দু’হাত ধরে ঝুলে পড়ল।

সে রাতে ফারহান মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, না, শাদি আমি আর করবো না। আমি এই অনাথ ছেলেমেয়েগুলোকে কষ্ট দিতে পারব না। যতই হোক, সৎ মা নিজের কথাটাই ভাববে। …..।

আজ গভীর রাতে গাঢ় ঘুমের মাঝে ফারহান স্বপ্ন দেখল, সায়রা বিবি হয়ে তার ঘরে এসেছে। সৎ ছেলেমেয়েদের মারধর করছে, না খাইয়ে রেখে কষ্ট দিচ্ছে। ওরা আব্বু আব্বু বলে কান্নাকাটি করছে। ….। ফারহান চিৎকার করে ওঠে। ঘুম ভাঙে। আলো জ্বালায়। ঘুমন্ত ছেলেমেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, আর নিজের চোখের জল মোছে। তারপর আবারও ঘুমানোর চেষ্টা করে।

ভোরে মসজিদের আজান শুনে ফারহানের ঘুম ভাঙে। একটু পরে আফসানাও জেগে ওঠে। শুধোয়, আব্বু, তুমি কি আজ বাড়ি থাকবে? কেন মা? না, আজ তো শুক্রবার, মসজিদে নামাজ পড়তে যাবে না? নারে মা, আজ আমি দেবেন মিস্তিরির সাথে কাজে যাবো। আল্লাকে আমি মনে মনে ডেকে নেবো। আফসানার ভয় হয়। দেবেন মিস্তিরি! সে তো হিন্দু। আব্বু, কাল বিকেলে তুমি যাওয়ার পর সোফিয়া চাচি এসেছিল। বুলছিল, তোদের আব্বু কোথায়? বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাসনাকো। হিন্দু-মুসলমানে মারামারি চলছে। ফারহান মেয়েকে বুকে টেনে নেয়। বোঝায়, ভয় নাই মা, দেবেন আমার ছোটবেলা থেকে বন্ধু। হাই স্কুলে সাত কেলাস পর্যন্ত একসাথে পড়েছি। তারপর তো দুজনেই লেখাপড়া ছেড়ে দিলাম। লেগে পড়লাম কাজে। কথা কী মা, তুমি এখনই  বুঝবে না। আমার কথা নয়, জ্ঞানী-গুণীরা বলেন, মারামারি কেউ নিজের থেকে করেনা, করানো হয়। তবে চাচি তোমার ঠিকই বুলেছে। বাড়ি থেকে বেরিও না। আমার ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যাবে। কতদিন স্কুলে যাই না, আব্বু। দুপুরের খাবারটাও নিতে পারিনা। লেখাপড়ার কথা এখন আর ভাবিও না। তোমার ছোট ভাইবোহিনদের কে দেখবে? তোমাকেই দেখতে হবে। আফসানা আব্বুর কথাটা বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল। কচি মনে ভাবতে লাগল, হ্যাঁ, আমিই ওদের আপামণি।

আজ দুপুরে ভীমেশ্বরে একটা বড়সড় গন্ডগোল হয়েছে। সম্প্রতি বাইরে থেকে কিছু জেহাদি লোকজন এসে কাশেমপুরে ডেরা পেতেছে। খারিজি মাদ্রাসার অভ্যন্তরে দিন তিনেক আগে জলসা হয়েছে। গোড়া মুসলমানদের সংগে তাদের বিশেষ মজলিশও বসেছিল। সকালে অজ্ঞাত পরিচয় কিছু যুবক ভীমেশ্বরের হিন্দুদের সর্বজনীন দূর্গা মন্দির ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দিয়ে কাশেমপুরের দিকেই গা ঢাকা দিয়েছে। লোকেদের অনুমান, গোড়া মুসলমানরা এই জঘন্য কাজে জড়িত আছে। খবরটা দ্রুত চাউর হয়ে গেল চারদিকে। ইতিমধ্যে মন্দিরের পুরোহিতের নেতৃত্বে হিন্দু পরিষদের লোকেরা প্রতিবাদে পথে নেমে পড়েছে। ওদিকে কাশেমপুরের গোড়া মুসলমানরাও মিছিলের আয়োজন করেছে। চৈত্রের গনগনে সূর্যটা তখন মাথার উপর। কাশেমপুরে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, ভীমেশ্বরের হিন্দুরা মুসলমানদের কাটতে কাটতে এগিয়ে আসছে। ভীমেশ্বরেও গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, কাশেমপুরের মুসলমানরা হিন্দুদের কাটতে কাটতে এগিয়ে আসছে। যেন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উন্মাদনা। আত্মরক্ষার নামে উভয় দিকের নিরীহ সাধারণ মানুষও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দলে দলে হাঙ্গামায় সামিল হয়ে পড়ল। মুহুর্মুহু বোমাবাজি, গুলিগোলা চলতে থাকল। একের পর এক মৃত্যুর খবরও শোনা গেল। ঘন্টা দুয়েক পরে খান চারেক পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল চৌরাস্তার মোড়ে। তান্ডব তখনও পুরোদমে। পুলিশের কিছু লোক বেগতিক দেখে কেউ কেউ চায়ের দোকানের ভেতরে, কেউ কেউ ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। বাকিরা দূরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ অসহায়ের মতো নৃশংসতা দেখতে লাগল। একটু স্বস্তির খবর যে, এইমাত্র অস্ত্র হাতে মিলিটারির দল নেমে পড়েছে। কার্ফু জারি হয়েছে। ফারহান বড়ই দুশ্চিন্তা করতে লাগল। রাত নেমে এসেছে। কেমন করে সে ঘরে ফিরবে? ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উপরঅলাকে ডাকতে লাগল, হে আল্লা, হে ভগবান, হে ঈশ্বর, তুমি তো একজনই। তবু তোমার সৃষ্টি মানুষেরা কেন বিভেদ কইরা মরে? জাত তো তুমি সৃষ্টি করোনি। আমাদের পূর্বপুরুষরাই করিছে। একদিন তাঁদেরই মধ্যেকার কোনো দু’ভাই হয়তো  একই মায়ের কোলে লালিত-পালিত হয়েছিল। বড় হয়ে এক ভাই ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হল। আজ তারই বংশ পরম্পরায় বৃদ্ধি পাওয়া উত্তর পুরুষদের কিছু লোক জিহাদ ঘোষণা করেছে। ওরা এই দ্যাশটাকে  মুসলমানগো দ্যাশ বানাতে চায়। আরেক ভাইয়ের বংশধরেরা সভ্যতার আদিকাল থেকে এই ভারতভূমিতে প্রবহমান সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে জীবন উৎসর্গ করেছে। আমিও তো পূর্বপুরুষদের বংশধরদেরই একজন। মুসলমান হলেও আমার রক্তেও সেই প্রাচীন সংস্কৃতির  ঐতিহ্য মিশে আছে। পণ্ডিতগণ বুলেন, ঐ সংস্কৃতির মধ্যেই জাগতিক সব সত্যের সন্ধান মেলে। ঐ সংস্কৃতি হল সনাতন ধর্ম। সিন্ধুর তীরে গড়ে উঠেছিল বলে ঐ ধর্ম আসলে হিন্দু ধর্ম। হিন্দু কোন জাত নয়, জাতীয়তার পরিচয়। তাহলে তো গর্ব করে বুলতে পারি, আমিও হিন্দু। হে আল্লা, অচেতনের ভেতরে চেতনা দাও। কালের নিয়মে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। সবই পাল্টে পাল্টে যায়, পূরানোকে নতুন হয়ে আসতে হয়, নতুন কিছু সৃষ্টি হয়। জাত যদি এত নিষ্ঠুরই হয়, তবে আজ থেকে জাত কথাটাকেই মুছে দাও। বিভেদের পাঁচিলটা সরিয়ে সবাই বলুক, আমাদের কুনো জাত নাই, আমরা শুধুই মানুষ। তুমি দুর্বুদ্ধির মানুষের মনে সুবুদ্ধি দাও আল্লা। দেবেন  ফারহানকে সাহস যোগায়। এই বিপদে সে বন্ধুত্বের পরিচয় দিতে প্রস্তুত। সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে সে অসহায় বন্ধুর হাত ধরে এগিয়ে চলে। তাকে নিরাপদে গ্রামের সীমানা পার করে দিয়ে ফিরে গেল দেবেন আর তার সঙ্গীরা।

ফারহানও বাড়ি ফিরল। আফসানা ভয়ার্ত চোখ-মুখে আব্বুর কাছে এসে দাঁড়ায়। আব্বু মেয়েকে সান্ত্বনা দেয়, ভয় নাই মা। অনেক রাতে রবিউল এসে ডাক দিল। সাথে আরও জনা চারেক। ছেলেমেয়েরা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফারহানেরও ক্লান্তির চোখ বুঝে আসছিল। রবিউল যেকথা বলতে এসেছে, তা বলতে লাগল, ফারহান ভাই, বাইরের পরিস্থিতি থমথমে। কাল কাজে বেরিও না। চিন্তা নাই, তোমাকে কাজ আমি দিব। মুম্বাই, দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর যেতে হবে না। মজুরিও অনেক  বেশি, তোমার কল্পনার বাইরে। ফারহানের তন্দ্রা কেটে গেল। তৎক্ষণাৎ মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, কী কাজ রবিউল ভাই? বাজি-পটকা বানাতে হবে গো। নতুন ব্যবসা শুরু করেছি। এরপর রবিউল পকেট থেকে পাঁচশো টাকার নোটের একটা বান্ডিল বের করে ফারহানের হাতে দিয়ে বলল, আগাম পাঁচ হাজার। কাজ চলতে থাকবে, এরকম বান্ডিলও তোমার হাতে আসতে থাকবে। ফারহান বেশ উৎফুল্ল হয়ে বিস্ময়ের সুরে বলে উঠল, বাজি-পটকার ব্যবসায় এত লাভ! ঠিক আছে, এ কাজ আমি করব। রবিউল নিশ্চিন্ত হয়, এরকমই একজন লোক খুঁজছিল সে। আপাতত মুম্বাই যাবার পরিকল্পনা দূর হল ফারহানের মাথা থেকে। হঠাৎ কয়েক জোড়া ভারি বুটের আওয়াজ ভেসে এল। রবিউল তার দলবল নিয়ে চটজলদি গা ঢাকা দিল অন্ধকারে। ফারহানও আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম আসছে না চোখে। অজানা, অচেনা কোন এক দুশ্চিন্তা মাথায় কিলবিল করে উঠছে। উঠে হাত বাড়িয়ে আবার আলোটা জ্বালায়। বালিশের নিচে রাখা পাঁচশো টাকার নোটের বান্ডিলটা তুলে নিয়ে দেখে, তার উপর হাত বুলায়। কাজ না করতেই এত টাকা! একসঙ্গে এত টাকা হাতের মুঠোয় কখনও ধরেনি সে। আজ ধরতে পেরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। জীবনের সব দুঃখ-ব্যথা,দুশ্চিন্তা নিমেষে দূর হয়ে গেল। তন্দ্রা আসে। সুখের ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখতে থাকে জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে নেবার।

(ক্রমশঃ)
…………………………………………………..