| অণুগল্প (কল্পনাপ্রসূত) | |
| ঈশ্বর দর্শন | – হরবিলাস সরকার |
পলসণ্ডা মোড়ে বাস থেকে নেমে এক যুবক জিজ্ঞেস করল, এই যে দাদা, এখানে নাকি ঈশ্বরের দর্শন পাওয়া যাচ্ছে, কোথায়, একটু নিয়ে যাবেন? অটোওয়ালা মুখ বাড়িয়ে উত্তর দিল, চাপুন না, নিয়ে যাচ্ছি। কাতারে কাতারে মানুষ ‘ঈশ্বর দর্শন’ করতেই যাচ্ছে।
জাতীয় সড়ক থেকে সীমানাপাড়া হয়ে কিরীটেশ্বরী মন্দির, একটু এগিয়ে জগদ্বন্ধুর ধাম। আর কিছুটা গেলেই প্রবহমান ভাগীরথী। পিচ-রাস্তাটা নদীর পাড় অবধি গিয়ে শেষ হয়েছে। সেখানে বটবৃক্ষতলে নয়নজুলির উপর মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে ‘নীলকন্ঠ বাবা’র আশ্রম। হঠাৎই তাঁর আবির্ভাব। কোথা থেকে এসেছেন, কেউ জানে না। লোকে বলে, সিদ্ধপুরুষ, ঈশ্বরের দূত, অবতার। ধরায় এসেছেন মানুষের মঙ্গল করতে।
এমন অবতারের নাম অল্পদিনেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর মন্দিরে কোন বিগ্রহ নেই। তিনি নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করেন। মন্দিরের দরজা সর্বক্ষণ বন্ধ থাকে। ভেতরে বাবা বেশির ভাগ সময় ধ্যানস্থ থাকেন। ওই সময় ভেতরে কারও প্রবেশ নিষেধ। বাবার বড় মাহাত্ম্য হল – উঁনি ঈশ্বরকে দর্শন করেন। মনে-প্রানে ভক্তি, বিশ্বাস থাকলে কোনো ভক্তকেও দর্শন করাতে পারেন। দরজার বাইরে বিরাজমান কয়েকজন শিষ্য। তারাই প্রতিদিন দর্শনার্থীদের ভিড় সামলায়, এছাড়া আশ্রমের যাবতীয় কাজকর্ম করে।
আশ্রমকে কেন্দ্র করে টোটো ও অটোচালকদের পোয়াবারো। জাতীয় সড়ক থেকে পঁচিশ টাকার ভাড়া এখন দ্বিগুণ। বাইরের লোক হলে আরও বেশি। তাতে অবশ্য ধর্মপরায়ণ লোকেদের গায়ে বাধেনা, ‘ঈশ্বর দর্শন’ বলে কথা।

আশ্রমে প্রবেশ করে প্রথমে বাবার দর্শন-প্রনামি একশো টাকা। তারপরে ঈশ্বর দর্শনের দক্ষিণা আলাদা। ভক্তি, সামর্থ্য অনুযায়ী ঈশ্বরের চরণে একশো, দুশো, পাঁচশো, হাজার কিংবা আরও বেশি উজাড় করে দিতে পারে।
প্রেমলতা তার পঁচিশোর্ধ বোবা মেয়ে ‘কুসুমকলি’কে নিয়ে এসেছে আশ্রমে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। এবার তাদের ভেতরে ঢোকার পালা। প্রেমলতার বড় আকুতি – ঈশ্বরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে বলবে, হে করুণাময়, আমার অসহায় মেয়েটার মুখপানে একটিবার চোখ মেলে তাকাও। স্বামী-ঘর করার বাসনা ওর পূর্ণ কর। দানপাত্রে প্রণামি বাবদ একশো-একশো দুশো টাকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল মা-মেয়ে।
বাবা নীলকন্ঠ ধ্যানস্থ থেকেই বলে উঠলেন, ‘প্রে-ম-ল-তা, এসেছিস? তোর ইচ্ছা পূর্ণ হবে। কুসুমকলি স্বামী-ঘর পাবে।’ প্রেমলতা অবাক হল। বাবা আমাদের মা-মেয়ের নাম, তাছাড়া মেয়ের ব্যাপারে জানল কী করে! পরক্ষণেই ভাবল, জানবে না কেন, উঁনি যে অন্তর্যামী। ঈশ্বর স্বয়ং ওঁনার মধ্যে বিরাজিত। প্রেমলতা তখন হাতজোড় করে বলল, বাবা, আপনার মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক। ঈশ্বরের কৃপা পেলে আমার অসহায় মেয়েটা বাঁচবে। অসীম দয়াময় সেই ঈশ্বরকে দর্শন করবিনা? হ্যাঁ বাবা, ‘ঈশ্বর দর্শন’ করতেই তো আসা।
দুশো টাকা দক্ষিণা দিয়ে বাবার পিছে পিছে ঘরের ভেতরে অন্ধকার কুঠুরি-ঘরে প্রবেশ করল দুজনে। ক্ষণিকের মধ্যেই মনোমুগ্ধকর ঝংকার ধ্বনিতে মুখরিত করে জ্যোতির্ময় ঈশ্বর নেমে এলেন উপর থেকে। প্রেমলতার চোখের জল নিঃশব্দে ঝরে পড়তে লাগল। বলল, ওগো দয়াময়, আমার হতভাগিনী মেয়েটাকে সুখ দাও। ঈশ্বরের চরণ-তলে মাথা ঠুকল কুসুমকলি। ঈশ্বর হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন। বললেন, ‘মঙ্গল হোক।’ তারপর পুনরায় ঊর্ধ্বগামী হয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।
স্বচক্ষে ঈশ্বর দর্শন হল। প্রেমলতাকে বাবা এবার বললেন, তুই এখন বাইরে যা। আমি ধ্যানস্থ হব। আর কুসুমকলি এখানে ঈশ্বরের বেদিমূলে মাথা নত করে পড়ে থাকুক। পূর্বজন্মের অর্জিত পাপ মুছে গেলে ঈশ্বরের আশীর্বাদী প্রসাদ নিয়ে ও বাইরে যাবে। মনে রাখিস, ওই প্রসাদ নিয়ম করে ও একাই খাবে। বাবার আদেশ শীরোধার্য হল। বেশ কিছুক্ষণ পর কুসুমকলি বাইরে বেরিয়ে এলে তাকে নিয়ে মা পরম শান্তিতে রওনা দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে।
এমনকরেই নিত্যদিন চলতে থাকল অগণিত দর্শনার্থীদের ঈশ্বর দর্শন।

মাস চারেক পর একদিন পুলিশের গাড়ি এসে থামল আশ্রমের দরজায়। গাড়ি থেকে নামল প্রেমলতা আর তার অন্তঃসত্ত্বা বোবা মেয়ে ‘কুসুমকলি’। বাবা নীলকন্ঠ অনন্যোপায় হয়ে আজ বাইরে বেরিয়ে এলেন। তাঁর দুগালে সপাটে দুটো চড় মারল কুসুমকলি। তাতেই পুলিশের চোখে সব স্পষ্ট হয়ে গেল।
আশ্রম ছেড়ে বাবা আর শিষ্যদের ঠাঁই হল গারদে। পুলিশ অফিসারের কাছে বাবা অকপটে স্বীকার করল, আমি এক বেকার যুবক ‘নীলকমল মাহাতো’। শিষ্যরা আমার বেকার বন্ধু। সবারই বাড়ি নদিয়ার নবদ্বীপে। স্যার, এম. এ পাস করেও চাকরি পাইনি। বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত। মা শয্যাগত। ঘরে অবিবাহিতা বোন। টোটো চালাতে শুরু করলাম। সংসার চলছিল না। তাই এ পথে নেমে পড়লি? না স্যার। তবে? জীবনে নারীর আঘাত সইতে পারিনি। কীরকম? একদিন আলাপ হয়েছিল দুজনের। ক্রমে সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় হয়। ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলাম। সে-ও লাজুক, শান্ত, নম্র ছেলেটাকে কথা দিয়েছিল। কিন্তু বাঁধ সাধল বেকারত্ব। টোটোওয়ালার প্রতি তার প্রবল ঘৃণা জন্মে গেল।
একদিন সত্যিই আমাকে দুঃখের দামোদরে ঠেলে দিয়ে সে বাঁধল সুখের ঘর। আমার অশান্ত মন তখন যুদ্ধ ঘোষণা করল দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। অতৃপ্ত প্রেম আমার ভেতরে এক বিকৃত মিলন-ক্ষুধার আগুন জ্বালিয়ে দিল। কীভাবে সামলাতি সেই আগুন? ক্লোরোফর্ম ব্যবহার করতাম। জ্ঞান ফিরলে ঈশ্বরের আশীর্বাদী প্রসাদ দিতাম, যার মধ্যে মেশানো থাকত ভ্রূণনিরোধক ওষুধ। সম্ভবতঃ কুসুমকলি প্রসাদ খায়নি। ভক্তদের মনের কথা আগে থেকেই কী করে জানতে পারতি? পরচুলা, মুখোশ, কেমিক্যালস, বিশেষ পোশাক ব্যবহার করে নীলকন্ঠ বাবাজি সেজে মন্দিরের ভেতরে থাকতাম। দরজার বাইরে সিসিটিভি লাগানো ছিল। শিষ্যরা ভক্তদের সাথে কথা বলে তাদের পরিচয়, মনের খবর জেনে নিত। ভেতরে বসে সিসিটিভির মাধ্যমে আমিও সবকিছু জানতে পারতাম। এবার বল্ – ঈশ্বর দর্শন কীভাবে করাতিস? বিশেষ কিছু আলোর কারসাজি করা একটা পুতুল ‘পুতুল নাচের পুতুলের মতো’ উপর থেকে নিচে নেমে আসত। ওটাই ঈশ্বর। আওয়াজ, কণ্ঠস্বরের জন্য ব্যবহার হতো শব্দযন্ত্র। এতটা দূরে অচেনা জায়গায় এসে আশ্রম বানালি কী করে? এসব কাজে দূরই নিরাপদ। ব্যবসা করব বলে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে পুঁজিটা বানিয়েছিলাম। জায়গার জন্য স্থানীয় বিধায়ক নিয়েছিলেন দশ হাজার টাকা। আশ্রমটা তৈরি হয়েছিল। ভেবেছিলাম, এখানে ছ’মাস কাটিয়ে অন্যত্র সরে পড়ব। কিন্তু তার আগেই …….।
অফিসার নীলকমলের পিঠ চাপড়ে দিলেন। নীলকমলের অশ্রুধারা বইতে লাগল। অফিসার বললেন, তোর শাস্তি হবেই। তবে চেষ্টা করব, যদি শাস্তি কিছুটা কমানো যায়।
বিচারের দিন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অশ্রুনয়নে নীলকমল নিজের অপরাধের কারণে অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে বিচারকের কাছে আর্জি জানাল, সাহেব, আমাকে ফাঁসি দিন, জীবনের সব যন্ত্রণা থেকে আমি মুক্তি পেতে চাই। উকিল বললেন, চমৎকার, এবার তাহলে তোমার সত্যিকারেই ‘ঈশ্বর দর্শন’ হবে। কিন্তু আদেশের বাণী লিখতে গিয়ে বিচারকের লেখনী থেমে গেল।
(স্রষ্টার কথাঃ কল্পনাপ্রসূত হলেও বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়।)
………………………………………………..