| (গল্প) | |
| ক্ষমতা-বৈভবের সিংহদুয়ার | – হরবিলাস সরকার |
( ‘স্রষ্টার লেখনীতে মৌলিক এই সৃষ্টি’ আসলে একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে শহরের অদূরে বিরাজমান সমাজ জীবনের বাস্তব এক চিত্রাঙ্কন। গল্পে ‘মণিগ্রাম’ একটি কাল্পনিক বিধানসভা কেন্দ্রের নাম এবং ‘মালঞ্চ’ একটি কাল্পনিক নদীর নাম। চরিত্রগুলোও কাল্পনিক। )
সমাজে জমিদারি প্রথা আজ আর নেই। তবু মণিগ্রামের উঁচু পাঁচিল-ঘেরা সুবিশাল বাগানবাড়িটা আজও জমিদার বাড়ি বলেই পরিচিত। বহু যুগ পরেও তার রূপ-জৌলুস বরং আগের চাইতে কয়েকগুণ বেড়েছে। ঠাকুরদার আমলের তিনতলা প্রাসাদ গগনচুম্বী অট্টালিকায় পরিণত হয়েছে। উত্তরপুরুষ ব্রজভূষণ রায়চৌধুরী পিতৃপুরুষের হার্ডওয়ারের ব্যবসাকে আরও বড় করেছেন। পাশাপাশি নানাবিধ ব্যবসাও জুড়েছেন। বিঘা পঞ্চাশেক তিন ফসলি জমি ঠাকুরদার আমলেই ছিল। তারপর বেড়ে কত হয়েছে, জানা নেই। তবে দশ বিঘা জমির উপর ইটভাটা আর বিঘা পাঁচেকের উপর চালকল বছর দুই-তিনেকের মধ্যেই হয়েছে। ব্রজভূষণের আরও একটা বড় পরিচয় আছে। বছর চারেক আগে তিনি ভোটে দাঁড়িয়ে লোকবল আর অর্থবলের জোরে মণিগ্রামের বিধায়ক হয়েছেন। মন্ত্রিত্বও পেয়েছেন। আর সেই থেকেই তিনি মানুষের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ।
তবে মণিগ্রামের মানুষের দারিদ্র্য ঘোচেনি। উপরন্তু হাহাকার আরও বেড়েছে। খান পাঁচ-সাতেক জাঁকজমক গাড়ির কনভয় নিয়ে রঙিন আলোকের দীপ্তি ছড়িয়ে মন্ত্রীমশায় তাঁর নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। যখন বাড়ি ফেরেন, লৌহ নির্মিত পেল্লাই সিংহদুয়ারের পাল্লা দুটো খুলে যায়। দীর্ঘ অপেক্ষারত এলাকার দুর্ভাগা মানুষগুলো দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগের কথা জানাতে পিছু পিছু ঢোকার চেষ্টা করে। বিধায়কের অস্ত্রধারী আত্মরক্ষ্মীরা বাধা দেয়। সিংহদুয়ারের প্রহরীরা লাঠি হাতে তেড়ে আসে। আত্মরক্ষ্মীরা দুর্ভাগাদের উদ্দেশে বলে, সাহেব এখন ক্লান্ত, কারও সাথে কথা বলবেন না। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কেউ জরুরি প্রয়োজনে পাশের ছোট দরজা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলে, কপালে জোটে প্রহরীদের তিরস্কার, ঘার ধাক্কা। এর পরেও তীর্যক বাক্যবাণ, তোরা এতই নির্লজ্জ? যেমন কুকুর তেমন মুগুর। দুর্ভাগা মানুষগুলো যন্ত্রণায় কেঁদে ওঠে। মন্ত্রীর উদ্দেশে কাতর হয়ে বলে, আপনি আমাদের জনপ্রতিনিধি, গরিবের ভগবান। বিপদে পড়ে এসেছি। দুটো মিনিট সময় দিন না বাবু! বৃথা ক্রন্দন।
নিত্যদিন এমনই ঘটে। কেউ কখনও প্রহরীদের খুশি করে অনুমতি পেলেও সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ দুষ্কর হয়ে ওঠে। বৈঠকখানার দুয়ার পাহারা দেয় বিদেশ থেকে আনা দুই-দুটো কুকুর প্রহরী। কুকুর তো নয়, যেন এক একটা জোয়ান বাঘ। সে বাধা অতিক্রম করে সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলেও তাঁর কড়া মেজাজ তীক্ষ্ণ তীরের মত এসে বিঁধে। ‘যখন-তখন কেন আসিস হতভাগারা? অপদার্থ যতসব! তোদের অভাব-অভিযোগ দূর করবার সাধ্য আমার নেই।……।’ দুর্ভাগারা মনের দুঃখে ফিরে যায়। ওদের দুর্দিনের শেষ হয় না।
কাছের বা প্রিয়জন কেউ এলে অন্য কথা। প্রহরীরা তড়িঘড়ি দরজা খুলে দেয়। বড় মাপের কেউ হলে সাহেবকে ঘিরে থাকা লোকেরা বেরিয়ে এসে নমস্কার অথবা সেলাম জানায়। ভেতরে নিয়ে গিয়ে বেশ সমাদর করে। সহকারীরা চা-বিস্কুট, মিষ্টি নিয়ে আসে। শুরু হয় গল্প-গুজব, দরকারি কাজের কথা।
সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটা দিন বিকেলবেলায় জনগণের জন্য সিংহদুয়ার খুলে দেওয়া হয়। সম্মানীয় কেউ কেউ এলে তাঁদের জন্য চেয়ার এগিয়ে দেওয়া হয়, বাকিরা বসে মেঝের উপর। সাহেব এক এক করে সমস্যা, অভিযোগের কথা শোনেন, নিরসনের প্রতিশ্রুতি দেন। মানুষগুলো আশায় বুক বেঁধে দিন কাটায়। কিন্তু সুদিন আসে না। ওরা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থাকে। অদৃষ্টের দোষ দেয়। তবুও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে।
প্রবাহমান মালঞ্চ’র ওপারে ভোরের রঙিন সূর্য ওঠে। সে দৃশ্য এপার থেকে দেখা যায় না। উচু উঁচু অট্টালিকা, বহুতলগুলো সেই শোভা আড়াল করে রাখে। অবশ্য সূর্য ওঠার আগেই সুলেখা, মিতালি, সাবিনা, চৈতালিরা বেরিয়ে যায় কাজে, ওপারে বাবুদের বাসায়। কেউ কেউ বাসন মাঝে, ঘর ঝাড় দেয়। কেউ কেউ রান্না করে। বয়সে ছোট হোক, বড় হোক, বাবুদের কাছে ওরা সবাই কাজের মেয়ে অথবা কাজের মাসি।
হিরু, সুজাতা, ফিরোজ, অলোকারা যখন ঘুম থেকে ওঠে, তখন সূর্য বহুতলের উপর থেকে ছাদের কিনারা ঘেঁষে উঁকি মারে। মুখ ধুয়ে ওরা মায়েদের রেখে যাওয়া জলখাবার খেয়ে বই নিয়ে বসে। ওরা সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে। কেউ কেউ প্রাথমিকে, কেউ কেউ উচ্চ বিদ্যালয়ে। কারও কারও ছোট ছোট ভাই-বোন আছে। তাদেরকে ওরাই দেখভাল করে। কেউ কেউ ভাই-বোনদের সাথে নিয়েই বিদ্যালয়ে যায়। আবার পল্টু, বুবাই, আলম, খগেনরা পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। বাসার কাজ সেরে মায়েরা যখন বাড়ি ফেরে, তখন সূর্য মাথার ঠিক উপরে। আপন আপন সংসারের যাবতীয় কাজ সেরে কেউ কেউ রান্নাবান্না করে, আবার অনেকেই করে না। বাবুদের বাড়ি থেকে আনা খাবারেই চলে যায়। ওদিকে ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয়ে রান্না করা ‘দুপুরের খাবার’ খায়।
বেলা তিনটে বাজতেই মায়েরা আবার রওনা হয় কাজে। ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরে মায়েদের রেখে যাওয়া অবশিষ্ট খাবার খেয়ে নেয়। তারপর ভাইবোনকে নিয়ে কেউ কেউ খেলা করে, কেউ কেউ গ্রামের দাদা বা দিদির কাছে টিউশন পড়তে যায়। মায়েরা ফিরে আসে রাত নামার পর। রাতের জেগে থাকা সময়টুকুতেই ছেলেমেয়েরা মায়ের আদর, স্নেহ-মমতা-ভালবাসা পায়। মাকে প্রাণ খুলে ‘মা’ বলে ডাকে। বাবাকে যে মাসের পর মাস কাছে পায় না, ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারেনা। মোবাইল ফোনের পর্দায় যেটুকু সময় বাবার ছায়া-শরীরটাকে দেখতে পায়, সেইটুকুই। অল্প সময়েই অনেক কথা হয়, বাবা তুমি কেমন আছো, খেয়েছো,….? বাবাও বলে, ভালো আছি,…., তুমি ভালো থাইকো সোনা, রাত অনেক হইছে, ঘুমিয়ে পড়। বাবার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে সোনা-মণিরা। বাবারও স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে। ভিন জেলা, ভিন রাজ্য থেকে যখন ফিরে আসে কয়েকদিনের জন্য, তখনই সোনা-মণিরা বাবাকে কাছে পায়।
কেউ কেউ আবার গোটা পরিবার সমেত ভিন রাজ্যে পাড়ি জমায়। কেউ বছরে একবার জন্মভিটেয় ফিরে আসে। কেউ কয়েক বছর বাদে বাদে ফেরে। যারা ভিন রাজ্যে যায় না, আবার বাড়ির মেয়েরাও বাসায় কাজ করে না, তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে এলাকাতেই মুনিশ খাটে। অনেকে মিস্ত্রি ও লেবারের কাজ করে। কেউ কেউ টোটো নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কেউ বাজারে সবজি বেচে। কারও কারও বাজার সংলগ্ন এলাকায়, মোড়ে মোড়ে, পাকা রাস্তার ধারে ধারে ছোটখাটো দোকান আছে। কেউ শহরে ছোটে অন্যের দোকানে কাজ করতে। কেউ চুল কাটে, কেউ পুরোহিতের কাজ করে। এদের ছেলেমেয়েরা সকাল আর রাতটুকু মা-বাবার সান্নিধ্য পায়। সব মায়েরা যে বাইরে কাজে বেরোয়, তাও নয়। অনেকে ঘর সামলায়, গৃহপালিত পশু, হাঁস-মুরগি পোষে। সরকারি চাকরিজীবী খুব কম আছে।
মালঞ্চ’র পশ্চিম পার বরাবর পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গ্রামের পর গ্রাম, সর্বত্রই একই চিত্র। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর চিত্র আরও করুণ। খরা, বন্যায় মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কত মানুষ ভিখারিতে পরিণত হয়েছে! তারা গান গেয়ে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ভিক্ষা করে। কেউ দেয়, কেউবা ফেরায়। নিত্য অনাহারীকে কে দেবে ক্ষুধার অন্ন? তবুও হাত পাতে। দয়ার দান যা পায়, তা-ই গ্রহন করে। জৌলুসহীন জীবনে রেশনের চাল-আটা, প্রকল্পের সুবিধাটুকু না পেলে ওদের অবস্থা আরও শোচনীয় হত। ওদের মূল্যবান ভোটের বিনিময়ে শাসকের এইটুকুই শুধু প্রতিদান।
জৌলুসহীনতার মাঝে কোথাও কোথাও জৌলুসভরা জীবনও আছে। সেখানে আলোর রোশনাই আছে। অট্টালিকা, প্রাসাদ, দামি দামি গাড়ি আছে। পাঁচিলঘেরা বিশাল বাগানবাড়ি আছে। নিরাপত্তা প্রহরী আছে। বৈভবের এই ঔজ্জ্বল্য দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখে সুলেখা, মিতালি, সাবিনা, চৈতালিরা। বাসার কাজে ওরা খুব একটা ছুটি পায় না। কোনদিন যদি ছুটি পায়, বিকেলের পড়ন্তবেলায় দু’চারজন মিলে গল্পের আসর বসায় কারও না কারও’র বাড়ির উঠোনে।
তেমনই এক বিকেলে তিনজনের আসর বসল সুলেখার বাড়িতে। আজ অন্য ধরনের গল্প। বাংলাদেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। ক্ষমতা দখলের লড়াই। সেখ হাসিনা রাজপ্রাসাদ ছেড়ে প্রাণ হাতে নিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছেন। খবরটা নিমেষে ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। বহু বছর পরে আজ সুলেখা, মিতালি, চৈতালিরা মনের আয়নায় দেখছে জন্মভূমি ‘বাংলাদেশ’কে। বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ময়দানে হারিয়ে যাওয়া ওপার বাংলার প্রাক-কৈশোরের স্মৃতি ভেসে উঠেছে চোখের সামনে। সুখ-দুঃখের কত যে কথা আছে! সেসব আজ উজাড় করে দিতে চায়। ওরে চৈতালি, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হইয়া বাংলাদেশ হইল, তখন আমাগো জন্ম হইছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের ঘাতকরা মুজিবরকে মাইরা ফেলাইল, সেসব কথা বড় হইয়া মায়ের মুখে শুইনাছি। তুই, আমি, মিতালি পিঠাপিঠি হইছি। একসাথে খেলা কইরাছি। আমার সাত বছর বয়স যখন, মা-বাবা আমাদের চার ভাই-বোনকে লইয়া চইলা আইল এদ্যাশে। কিছুদিনের মধ্যে তোরাও আইলি। মনে পড়ছে না তোর, চৈতালি? সুলেখা রে, সে কি ভোলার কথা! ভাগ্যক্রমে আমাগো একই গ্রামে বিয়া হইল। আবার সেই আমাগো বন্ধুত্ব, ছোটবেলার মতোই। মিতালি, তোর মনে আছে – আমরা সর্ষে ক্ষেতের আল ধইরা দৌড়াতাম। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, আমাগো দ্যাশের জাতীয় সংগীত, সুর কইরা আমরা তিনজনে গাইতাম। সব মনে পড়ে, চৈতালি। সেই সোনার বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। বিত্তবানদের দুয়ারে তার আঁচ লাগল না। মরতে লাগল গরিবরা। বাবা একদিন মা-রে কইল, প্রমিলা, এই দ্যাশে আর থাকবো না। জমি-জমা একে একে সব বিক্রি হইয়া গেল। এবার তো না খাইয়া মরতে হবে। চলো, আমরা ভারতে চইলা যাই। তারপর সত্যিই আমরা চইলা আইলাম তোগো সাথে। মিতালি রে, তোগোর মতো অবস্থা আমাগোও হইছিল। সুলেখারাও কি কম কষ্ট ভোগ কইরাছে ওদ্যাশে? হ্যাঁ রে চৈতালি, তুই ঠিক বইলাছিস। সেকথা মনে করলে চোখে জল আসে। আচ্ছা চৈতালি, মিতালি, তোগো মনে পড়ে – আমাগো প্রাইমারি স্কুলের কথা? স্কুলের পিছনে একটা নারকোলি কুল গাছ ছিল? আমরা কুল পাইরা খাইতাম। মাঠে গোল্লাছুট খেলতাম। হ্যাঁ রে, খুব মনে পড়ে। সেকথা ভুলি কেমন কইরা! জানিস, আমরা যেদিন ভোরবেলা ভারতে আসবার জন্য রওনা হইছিলাম, সেদিন হেড স্যার ‘মইনুদ্দিনবাবু’ খবর পাইয়া চইলা আইছিল। বাবাকে বললেন, পরিমল ভাই, এই দ্যাশে তোমরা-আমরা যুগ যুগ ধইরা একসাথে বসবাস কইরা আসতেছি। দ্যাশ স্বাধীন হইল, এখন তোমরা আমাগো ছাইড়া চইলা যাইবা? জানি, তোমাগো চইলা যাওয়া, আমি আটকাইতে পারমু না। অভাব তোমাগো যাইতে বাধ্য করছে। সোনার বাংলার মাটি বন্ধ্যা হইয়া যাইতেছে। দলে দলে হিন্দুরা চইলা যাইতেছে ভারতে। মুসলমানরাও যাইতেছে। যাও, ভালো থাকিও। আজ হেড স্যারের কথা খুব মনে পড়ছে। এতদিনে উনি আর নিশ্চয়ই বাঁইচা নাই।
কিন্তু সুলেখা, এদ্যাশে আইসাও কি আমরা ভালো আছি? না রে মিতালি, ভালো আর কই? অভাগিনী যেখানে যায়, কপাল সাথে লইয়াই যায়। বাবুগো বাসায় কাজ করি, খাই। কোন রকমে দিন চইলা যায়। স্বামী-স্ত্রী দুইজনে খাটি। পাকা একখান ঘর কইরাছি, এই পর্যন্তই। কিন্তু মনের সুখ কোথায়? স্বামী পইড়া থাকে ভিন রাজ্যে। কম দুঃখের কথা, নাকি বলিস চৈতালি? হ্যাঁ রে সুলেখা, এর চাইতে বড় দুঃখের কথা আর কী হইতে পারে? তবুও আমি বলব – মন্দের ভালো। দুটো খাইতে তো পাই। যেমনই হউক, ছাদের তলায় মাথাখান গুঁজতে পারতেছি।
বছর পঁচিশের কন্যাসম ‘লক্ষ্মী’ আড়ালে দাঁড়িয়ে জেঠিমাদের গল্প শুনছিল। কাছে এসে বলল, কীগো জেঠিমারা, বাংলাদেশের গল্প করছ? শুনলাম, বলাবলি করলে – অভাবের তাড়নায় এদেশে চলে এসেছো। কিন্তু অনেকে তো বলে, তোমরা মুসলমানদের অত্যাচারে এদেশে চলে এসেছে। তা তোমাদের উপর সত্যিই অত্যাচার হয়নি? মিতালি জেঠিমা উত্তর দেয়, ও মেয়ে, তোরা এ দ্যাশের মানুষ, তোর বয়সও অল্প। দ্যাশটাকে তোরা নিজের চোখে দেখিসনি। শোনা কথা সবসময় সত্য হয় না। তবে অত্যাচার, মারামারি কোন্ দ্যাশেই না হয়? এখানেও তো জমি-জমার দখল, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের উৎপাত, আরও কত কিছু লইয়া হিন্দু-মুসলমানে মারামারি হয়। হিন্দুতে-হিন্দুতেও লড়াই, মারামারি বাঁধে। এই যে তুই মুসলমান ছাওয়ালরে ভালবাইসা চইলা গেছিলি। তোর বাপ-দাদা মাথা গরম কইরা ছুইটা গেল। ভালোবাসার মূল্য না দিয়া ছাওয়াল আর তার বাপের মাথা ফাটাইয়া দিয়া তোরে ফিরাইয়া লইয়া আইল। তারপর ওরাও দলবল লইয়া আইসা তোর বাপ-দাদারে মাইরা গেল। এইটারে তুই কী বলবি, হিন্দু-মুসলমানে মারামারি? কথা মাজলে বড় হয়, অন্যরকমও হয়। ওদ্যাশে থাকতে আমার বাবাও এক মুসলমান চাচাকে হাটের মধ্যে বেধড়ক মাইরাছিল। জিনিস ওজনে কম দিছিল। সেই নিয়ে তর্কাতর্কি হইতে হইতে মারামারি। পাশের মুসলমানরা তো উল্টে চাচাকেই বকছিল, ‘কেন তুমি জিনিস ওজনে কম দিবা? ……?’ শোন্, এক জায়গায় থাকলে একটু-আধটু ঠোকাঠুকি হয়। তাই বইলা বানাইয়া, না বুইঝা মিছা কথা? কিন্তু জেঠিমা, দাদুর মুখে শুনেছিলাম – দেশ ভাগের পর ওদেশে হিন্দুদের ভিটে-মাটি খোয়াতে হয়েছে। কাতারে কাতারে হিন্দুরা এদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আবার একাত্তরের যুদ্ধের সময় হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মেয়েদের উপর অত্যাচার করা হয়েছে। এসব কি মিথ্যে?
চৈতালি জেঠিমা আগ বাড়িয়ে উত্তরটা দিল, ওরে, সেসব মিথ্যে হইবে কেন? তবে কী জানিস, সাধারণ মানুষ সেইসবে মদত জোগায়নি। সব দ্যাশেই দাঙ্গাবাজ, যুদ্ধবাজরা এইসব করায়। সমাজের চূড়ায় যাঁরা থাকেন, তাঁরা যদি নীতি-আদর্শ ভুইলা যান, তাঁরা তখন অমানুষ হইয়া যান। মুখোশটা মানুষের বইলা তাঁগো চেনা যায় না। তাঁরা অর্থ, ক্ষমতা, দম্ভের বলে বলশালী। তাঁগো চারপাশে ছায়ার মতো যেসব সুবিধাভোগী সাধারণ মানুষ ঘোরাঘুরি করে, তারাও অমানুষ হইয়া ওঠে। তাগো দিয়াই উপরতলার ঐ মানুষগুলো এইসব জঘন্য কাজ করাইয়া লন।
সুলেখার দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ে। চৈতালি জিজ্ঞেস করে, কীরে সুলেখা, কী ভাবছিস? ভাবছি, দ্যাশে দ্যাশে সব শাসকের চরিত্রই এক। নিজেগো স্বার্থে ওরা দাঙ্গা বাঁধায়, যুদ্ধ বাঁধায়। মরে নিরীহ সাধারণ মানুষগুলাই। পিতৃপুরুষের ভিটামাটি ছাইড়া আইলাম এপার-বাংলায়। এখানেই বা শান্তি কোথায়? শুইনাছি, সামনে আবারও ভোট আইতেছে। কী যে হইবে! রাত নামে পৃথিবীতে। গল্পের আসর ভাঙে।
এমনসময় প্রতিবেশী মোক্তারের বিবি ‘সাবিনা’ কাজ থেকে বাড়ি ফিরছিল। ভাবল, সূলেখাদিকে খবরটা দিয়া যাই। হেঁয়ালি করে হাঁক দিল, ও বরিশালের দিদি, বাড়ি আছো? সুলখাও বাইরে বেরিয়ে হেঁয়ালি করে উত্তর দিল, কীগো ফরিদপুরের মাইয়া, কী কইবা? শুইনাছো, সেখ হাসিনা এই দ্যাশে পলাইয়া আইছে। শুইনাছি লো শুইনাছি। এবার তোরে আমি একখান খবর শুনাই, আমাগো এখানে আবার ভোট আইতেছে, বিধানসভার ভোট। ভোটের খবর শুইনা কাম নাইগো দিদি। ভোট দিয়া গরিবের কী হইব? যাই আমি, ছাওয়ালটা এতক্ষণে পথের দিকে তাকাইয়া আছে।
পরদিন থেকে সত্যি-সত্যিই আনাচে-কানাচে বিধানসভা-ভোটের গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। এক বছরেরও কম সময়। ওদিকে এরই মাঝে ব্রজভূষণের বারো বিঘা জুড়ে বাগানবাড়িতে শুরু হয়েছে স্বর্গোদ্যান তৈরীর কাজ। সেখানে বিনোদনের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশের নানান কুরুচিপূর্ণ মূর্তি বসানো হচ্ছে। ফুলের গাছ লাগানো চলছে। বাগানের রাস্তাগুলোয় রংবেরংয়ের গালিচা পাতা হচ্ছে। কত কিছু!
চাপা তুষের আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলতে জ্বলতে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। প্রচন্ড দাবদাহ গোটা মণিগ্রামের চারদিকের সীমানা জুড়ে। তারপর ধূসর কালো মেঘ জমল ঈশান কোণে। বিধংসী ঝড় উঠল আকাশে-বাতাসে, গোটা রাজ্য জুড়ে। পরিবর্তনের ঝড়। যত অন্যায়, অবিচার, কালিমা, সব মুছে ফেলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অত্যাচারিত, নিপীড়িত, শোষিত মানুষগুলো।
সবার সামনের সারিতে সুলেখা, মিতালি, সাবিনা, চৈতালি। একদিন জনতার দরবারে মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে সুলেখা কেঁদে ভাসাল। ভেতরের যন্ত্রণার কথাগুলো বলতে লাগল, বন্ধুগণ, মনে আছে – চার বছর আট মাস আগের কথা? ব্রজভূষণ রায়চৌধুরী আমাগো দুয়ারে দুয়ারে আইসা হাতজোড় কইরা বইলাছিল, আপনারা আমাকে সমর্থন দিন, আপনাদের প্রতিটা ভোট উপহারস্বরূপ আমাকে দিন, আমি আপনাদের সুখ-দুঃখে বিপদে-আপদে সর্বদা পাশে পাশে থাকবো। সাধারণ পোশাকে, হাঁটতে হাঁটতে ঘাম ঝইরা পড়া ক্লান্ত মানুষটাকে দেইখা মনে হইছিল – বড়লোক হইলেও, উচ্চবর্ণের হইলেও, উঁনি আমাদের প্রকৃত বন্ধু। কিন্তু না, উপরতলা থেকে নিচ তলায় নাইমা আসা মুখোশ পরা মানুষটাকে চিনতে না পাইরা সেইদিন আমরা ভুল কইরাছিলাম। ওঁনার পোষ্য জীবেরাও কত আদর-যত্ন পায়! আর আমরা পিছিয়ে পড়া দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ, ওঁনার কাছে ঘৃণার পাত্র। ওঁনার দুয়ারে গিয়া ভিখারি ভিক্ষা পায়না। পথের কুকুর ডাস্টবিনের খাবার খাইয়াও শান্তিতে বাঁচে। কিন্তু আমাদের জীবনের শান্তি উঁনি কাইড়া নিয়াছেন। …….। বড় দুঃখের কথা, আমি আমার নির্যাতিতা মেয়ের বিচার চাইতে বারবার ওঁনার সিংহদুয়ারে ছুইটা গিয়াছি। ভেতরে ঢুকতে দ্যাননি। চিৎকার কইরা বইলাছি, শুইনাও শুনতে পাননি। মেয়ে আমার শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বাইছা নিল। শুধু আমারই কোল খালি হয়নি। মণিগ্রামের বহু মায়ের কোল আজ খালি। বহু অপরাধের নায়ক উঁনি। বন্ধু, বহু দুঃখ আছে এই হৃদয়ে গাঁথা। তাই আজ অপরাধীর বিচারের দাবিতে পথে নাইমাছি। …….।
আন্দোলনের ঢেউ সুনামিতে পরিণত হল। সুলেখা জনতার মধ্যমণি হয়ে উঠল। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঘোষণা হয়েছে। আর মাত্র চার মাস বাকি। দক্ষিণপন্থী শাসকদলের পক্ষ থেকে ব্রজভূষণ এবারও টিকিট পেয়েছেন। অত্যাচারীত, বঞ্চিত, নিপীড়িত নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নির্দল প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হল ‘সুলেখা বারুই’।
মানুষের মুক্তির পথের সন্ধান সুলেখা পায়নি। শোষণের জগদ্দল পর্বতসম যন্ত্রটাকে উপড়ে ফেলার উপায় তার অজানা। এসব বোঝেও না। তার উপর ‘শ্রমজীবী মানুষের যে দল’ বহুকাল শাসন ক্ষমতায় ছিল, তাঁরা মুখে গরিবের কথা বললেও, আসলে তাঁরা গরিবের প্রতিই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, মুখোশের আড়ালে গরিবকেই শোষণ-যাঁতাকলে পেষণ করেছে। এঁদের থেকে দূরে থেকেছে সুলেখা। এহেন অবস্থায় জীবনের বহু যন্ত্রণাকে সাথী করেই সে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে লাগল। সে এখন সবারই ঘরের আপনজন। সবারই কণ্ঠে সুলেখার জয়ধ্বনি। ব্রজভূষণ শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেও শক্তিহীন হয়ে পড়ল। অবশেষে ঘনিয়ে এল নির্বাচনের দিন। দিনটা মানুষের উৎসবে পরিণত হল। দিনশেষে ভোটপর্ব শেষ হলে নেমে এল এক গভীর নিস্তব্ধতা। তারই মাঝে চলছে কৌতূহলী মানুষের আলোচনা – ‘কে জিতবে, কে হারবে’।
পরদিন ভোট গণনা হল। বিজয় মুকুট উঠল সুলেখা বারুইয়ের মাথায়। সামান্য পরিচারিকা থেকে সে এখন বিধায়িকা। সব থেকে বেশি খুশি মিতালি, চৈতালিরা। আরও বেশি খুশি এই কারণে যে, রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। দক্ষিণপন্থী আরেক দল ক্ষমতাসীন হয়েছে।
মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে সুলেখা সাদর আমন্ত্রণ পেয়ে যোগ দিল নতুন শাসক শিবিরে। মন্ত্রিত্বও পেল। দিন পেরোতে থাকল। সুলেখাকে প্রায়ই কোলকাতায় যাতায়াত করতে হয়। মাঝেমধ্যে এম.এল.এ হোস্টেলে থাকতে হয়। তাঁর স্বামী রাজমিস্ত্রির কাজ ছেড়ে দিয়ে একটা স্টেশনারি দোকান দিয়েছে। তার পোশাকে পরিবর্তন হয়েছে, চোখে চশমা উঠেছে। দোকানে এক যুবককে মাস মাইনেয় কর্মচারী হিসেবে রেখেছে। লোকেরা এখন আর তাকে ‘পাঁচু’ মিস্ত্রি বলে ডাকে না। সে এখন পাঁচুগোপালবাবু।

কয়েকটা মাস পেরোতেই পাঁচুগোপালবাবুর বাড়ির চেহারাটাও বদলে গেল। একতলা বাড়িটা দোতলা হয়েছে। তাতে বালি, সিমেন্ট আর রংয়ের প্রলেপ পড়েছে। দেয়ালের গায়ে পাথরে খোদাই করা নেমপ্লেট লাগানো হয়েছে, যার উপর লেখা – মণিগ্রামের বিধায়িকা শ্রীমতি সুলেখা বারুই। দিনে দিনে তিনি এলাকার গণ্যমান্য লোকেদের কাছে সুলেখা থেকে সুলেখাদেবী হয়ে উঠেছেন। ‘দেবী’ কথাটা যুক্ত হওয়ায় সুলেখাও মনে মনে নিজেকে উচ্চাসনে, উচ্চস্তরে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। কিছু কিছু ইংরেজি কথাও শিখেছেন। মাতৃভাষার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ উচ্চারণ ভঙ্গি রপ্ত করার চেষ্টা করছেন। আড়ম্বরেরও শেষ নেই। দামি শাড়ি পরছেন। সরকারি গাড়ি পেয়েছেন। পেয়েছেন দুজন অস্ত্রধারী আত্মরক্ষ্মী।
ভোটে জেতার পর সেই যে বিজয় মিছিলে চৈতালি, মিতালি, সাবিনারা আবির খেলেছিল, মিষ্টি খেয়েছিল, তারপর আর একসাথে মিলিত হবার সুযোগ হয়নি। একদিন বিকেলে চৈতালি আর মিতালি এল সুলেখাদেবীর সাথে দেখা করতে। বৈঠকখানায় প্রাক্তন বিধায়ক ব্রজভূষণকে অতি সাধারণ পোশাকে দেখে গেল। সাথে ওঁর সাঙ্গপাঙ্গরাও চেয়ারে বসে আছে, যারা এতদিন মানুষের টাকাপয়সা লুটেপুটে খেয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে। কিছু একটা বিষয় নিয়ে কথাবার্তা চলছিল। কথা শুনে ওরা বুঝতে পারল – ব্রজভূষণ বর্তমান শাসক দলে যোগ দিয়েছেন। মন খারাপ নিয়েই কাছাকাছি দুখানা ফাঁকা চেয়ার দেখে বসতে যাচ্ছিল সুলেখাদেবীর বান্ধবীরা। ওদের পোশাক-আশাক, আপাদমস্তক ভালো করে লক্ষ্য করছিল সুলেখাদেবীর দুই সহকারী। একজন দ্রুত এগিয়ে এসে বলল, তোমরা মেঝেতে বসো। সুলেখাদেবী দেখেও যেন দেখলেন না। চৈতালি, মিতালির ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ব্রজভূষণ আর তাঁর লোকেরা কথা বলার মাঝে মাঝে ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করছিলেন। তা শোনার পর নাম ধরে কথা বলতে ইতস্ততঃ বোধ করছিল বান্ধবীরা। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ চোখে চোখ পড়ায় চৈতালি বলে উঠল, ম্যাডাম, আপনার সাথে কয়টা কথা বলতে আইছি। কতকালের একান্ত সাথী হওয়া সত্ত্বেও সুলেখাদেবীও আজ ‘তুই’, ‘তোরা’ শব্দ দুটো মুখে আনতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, তোমরা কীজন্য এসেছো? ভেবেছিল, সময় বেশি না পেলেও সুখ-দুঃখের দুটো কথা বলবে। সংসারের অভাব-অভিযোগের কথাও বলবে। তা যখন হল না, চৈতালি একগাল হেসে বলল, এলাকাবাসী হিসেবে আসা। মিতালিও হেসে বলল, ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলতে পারেন। ইতিমধ্যে ফোন এসে পড়ায় ‘ঠিক আছে, পরে কথা হবে’ বলে সুলেখাদেবী ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। চৈতালি, মিতালি ‘আসি ম্যাডাম’ বলে বেরিয়ে চলে গেল। আর কখনো সাক্ষাতের ইচ্ছা হয়নি।
বছর দুই পর মিতালির বড় মেয়ে পূর্ব পরিচিত এক যুবকের দ্বারা পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হল। যুবক পলাতক। সে আর কেউ নয়, ব্রজভূষণের অতি নিকট আত্মীয়ের ছেলে। মিতালি, সাবিনা, চৈতালিরা সুলেখাদেবীর দরজায় ছুটে গেল। দরজাটা এখন খুব বড়োসড় এবং রংবাহারি হয়েছে। ব্রজভূষণের সিংহদুয়ারের মতো না হলেও কম কিছু নয়। সেই দুয়ার ভেদ করে ভেতরে ঢোকার অনুমতি মিলল না। দুয়ারের এপারে দাঁড়িয়েই চিৎকার করে মিতালি, সাবিনা, চৈতালিরা বলে গেল – আমরা বিচার চাই। বিচার চাই। ……। দুদিন পর সুলেখাদেবী ঘটনাস্থলে গেলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, পুলিশ ছেলেটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। প্রভাবশালী ঘরের ছেলে। ধরাটা পড়ুক। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি পাবেই। আইন আইনের পথেই চলবে।
মিতালি, সাবিনা, চৈতালির বুকফাটা কান্না থামল না। ওরা পাগলিনীর বেশে এ দুয়ার, ও দুয়ার ঘুরতে লাগল। কখনও মূখ্যমন্ত্রী, কখনও আদালতের দুয়ার। বারবার ছুটে এল সুলেখাদেবীর কাছে। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অতিবাহিত হল।
আবারও এল সেই বিধানসভার ভোট। সুলেখাদেবী দ্বিতীয়বার ভোটে জিতে পুনরায় মন্ত্রী হয়েছেন। তাঁর সিংহদুয়ারের ঔজ্জ্বল্য আরও বেড়েছে। তার পাশে জলের ফোয়ারা বসেছে। পথের ধুলায় ঠায় বসে তিন পাষাণ প্রতিমা – মিতালি, সাবিনা আর চৈতালি। আজ বিচার চাইতে আসেনি। এসেছে নীরব প্রতিবাদ জানাতে। কন্ঠ ওদের রুদ্ধ হয়েছে। নেই আজ চোখে জল। বিচারের আশায় কেঁদে কেঁদে ওদের চোখের জল শুকিয়ে গেছে।
……………………………………………………