পরিযায়ীর সংসার /৭ম পর্ব
উপন্যাস

ভোরের আলো সবে ফুটে উঠেছে। ওদিকে ঈশান কোণে জমেছে ধূসর কালো মেঘ। রেহেনা, সামাদ এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। ফারহান বিষন্ন মনে বারান্দায় বসে কত কী ভাবছিল। এমনসময় রবিউল তার দলবলসহ মৌলবিকে সঙ্গে নিয়ে এসে ফারহানের উপর চড়াও হল। মৌলবি বললেন, ফারহান, কাল বাদে পরশু নতুন চাঁদ উঠবে আকাশে। মুসলমানরা খুশির ইদ পালন করবে। কিন্তু তার আগেই তোমাকে গ্রাম ছাইড়া চইলা যাইতে হবে। কেন মৌলবি সাহেব? কেন’র উত্তর তো তোমাকে দিব না। রবিউলের এক শাগরেদ ‘মোস্তফা’ এগিয়ে এসে ধমক দিয়ে বলল, এই বিধর্মী, তুই মৌলবিকে প্রশ্ন করছিস, তোর সাহস তো কম না? রোজা করিস না, নমাজ পড়িস না, তুই কি আর মুসলমান আছিস? আজ এই মুহূর্তে তোকে বাড়ি ছাড়তে হবে।
অবস্থা বেগতিক দেখে ফারহান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে চুপ করে রইল। মৌলবি মসজিদের দিকে রওনা হল। রবিউলও তার লোকজন নিয়ে চলে গেল। ফারহান চোখের জল ফেলতে লাগল। এতক্ষণে রেহেনা, সামাদ ঘুম থেকে উঠে আব্বুকে কাঁদতে দেখে তার কাছে এসে বসল। রেহেনা আব্বুর চোখের জল মুছে দেয়। জিজ্ঞেস করে, তুমি কাঁদছো কেন? মা রে, আমাদের এখনই বাড়িঘর ছাইড়া চইলা যাইতে হবে। ছোট্ট মেয়ে ভালো-মন্দ বোঝে না, তবু যে একটা বিপদ এগিয়ে আসছে, তার আঁচ পেয়ে কাঁদতে থাকে। ওকে দেখে সামাদও কাঁদে।
ফারহান মনটাকে শক্ত করল। বেটা-বেটিকে শান্ত করে জলখাবার খেতে দিল। তারপর সবকিছু গোছগাছ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝড়িয়ে বেটা-বেটিকে নিয়ে রওনা হল করিম চাচার বাড়ির উদ্দেশ্যে। বেলা তখন ন’টার কাছাকাছি। কালবৈশাখীর দমকা হাওয়া ধেয়ে এল ধুলা উড়িয়ে। ফারহান গাছতলায় আশ্রয় নিয়ে ছেলেমেয়েকে আগলে ধরল।
ঝর থেমে গেলে করিম চাচার বাড়ি গিয়ে পৌঁছাল ফারহান। চাচার ছোট্ট বাড়িটায় বাড়তি কোন ঘর নেই। তবুও একটা দিনের জন্য থাকার ব্যবস্থা করলেন। পরদিন সকালে চাচা ফারহানকে নিয়ে চলে গেল চাঁদনীপুর গ্রামে চন্দ্রনাথের বাড়িতে। চন্দ্রনাথের স্ত্রী আর দশ বছরের ছেলেকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। টালির চালার একখান গোয়ালঘর ফাঁকা পড়ে আছে। এখন আর গরু পোষেনা। চন্দ্রনাথ নিজে ওই ঘরটাকেই পরিষ্কার করে ফারহানের থাকার ব্যবস্থা করে দিল। আজ আর কাজে গেল না ফারহান। চন্দ্রনাথের স্ত্রী ‘পারুল’ খাবারের ব্যবস্থা করে দিল। দুপুরের পরে ফারহান কাশেমপুরে গিয়ে পড়ে থাকা জিনিসপত্র নিয়ে এল।
দিনকয়েক পর এক সন্ধ্যায় চন্দ্রনাথের বাড়িতে এল করিম চাচা। চাচা যে আসবে, চন্দ্রনাথ তা আগে থেকেই জানতো। কিছুক্ষণের মধ্যেই বছর পঁয়ত্রিশ-চল্লিশের তিন যুবক এসে হাজির হল। ওরা হল- শ্যামল হেমরম, শান্তনু ডেভিড ও ফিরোজ মন্ডল। পারুল পাশের বাড়ির কলেজে পড়া মেয়ে ‘কবিতা’কে ডেকে আনল। এ যেন এক ঘরোয়া সভার আয়োজন। ফারহান বুঝে উঠতে পারছে না- কী হবে। চন্দ্রনাথ যখন একে একে সবার পরিচয় করিয়ে দিল, ফারহান অবাক হল। বলেই ফেলল, অদ্ভুত এই গ্রাম। নাম শুনে তো মনে হল – এখানে অনেক ধর্মের লোক বসবাস করে। চাচা বলল, ফারহান, তুমি ঠিকই বুঝেছ। তোমাকে একটু খুলে বলি, এ গ্রামে আমার প্রায়ই পায়ের ধুলা পড়ে। এখানে দু’ঘর মুসলমান, এক ঘর খ্রিস্টান, পাঁচ-ছয় ঘর সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে, বাকিরা হিন্দু। তার মধ্যে চন্দ্রনাথের স্ত্রী ওই যে কবিতা নামে মেয়েটিকে ডেকে এনেছে, ওরা ব্রাহ্মণ। আরও তুমি অবাক হবে, এখানে কোন জাত বা সম্প্রদায়ের নামে পরিচয় হয় না। সবাই মানুষ। সবাই সবার বাড়িতে অবাধে যাতায়াত করে। ধর্ম যে যার মতো নিজ নিজ ঘরে পালন করে। আবার কেউ কেউ প্রচলিত কোনো ধর্মই পালন করে না। মানুষে মানুষে কোনো বিরোধ নাই। বড় অদ্ভুত, এখানে মন্দির, মসজিদ, গির্জা কিছুই নাই। এগুলোকে এরা বিভেদের চিহ্ন মনে করে। বছর দু’বার সবুজ দুর্বা ঘাসের মাঠে মেলা বসে, মিলন মেলা। সেই মেলায় ছোটদের খেলনা, বিনোদনের সামগ্রী আসে, বড়দের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। আর নতুন ধান উঠলে নবান্ন উৎসব হয়। চাচার মুখে যতই শোনে, ততই অবাক হয় ফারহান। মনে মনে ভাবে, এইতো আমার বসবাসের উপযুক্ত স্থান। যেন পৃথিবীর উপর এক চিলতে স্বর্গভূমি। …..। সারা পৃথিবীটা যদি এমন হত! চন্দ্রনাথ বলল, ফারহান দাদা, এ গ্রামের আরও একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে রাজনীতির কোনো কচকচানি নেই। তবে বিভিন্ন দলের নীতি-আদর্শ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। আলোচনা শেষে ভালো যা কিছু, সকলে সেইটুকু মেনে নেয়। প্রাইমারি একটা স্কুল আছে। ভোটের সময় ওখানে একটা বুথ হয়। পঞ্চায়েত ভোটে গ্রাম থেকে একজন নির্দল প্রার্থী হন। তিনি বিনা বাধায় জয়লাভ করেন। বিধানসভা, লোকসভার ভোটে প্রার্থীদের মধ্যে যিনি ভালো মানুষ বলে মনে হয়, সকলেই জোটবদ্ধভাবে তাকে ভোট দিয়ে আসেন। প্রার্থী ভালো না হলে নো ভোট দেন।
এসময় চা-বিস্কুট নিয়ে এল পারুল আর কবিতা। পারুল চা দিতে লাগল। কবিতা হাতে হাতে বিস্কুট দিতে দিতে নতুন দুজন ছোট বাচ্চাকে দেখে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের কী নাম? বাচ্চারাও হাসিমুখে উত্তর দিল, আমি রেহেনা, আমি
সামাদ। বাঃ কী সুন্দর নাম! রেহেনা, সামাদ বিস্কুট নাও। কবিতা দিদির হাত থেকে বিস্কুট নেয় দুজনে।
চা-বিস্কুট দেওয়া শেষ হলে পারুল, কবিতা
আসন পেতে বসে। পারুলের এবার চোখ যায় বাচ্চাদের দিকে। বলে, এই যে রেহেনা, সামাদ, তোমাদের স্কুলে যেতে হবে, লেখাপড়া শিখতে হবে। বিকেলে তোমাদের এই কবিতা দিদির কাছে পড়তে যেতে হবে। ফারহান উজ্জীবিত হয়ে বলে, এটা তো আনন্দের কথা। কবিতা মা, আমার ছেলেমেয়েরা তোমার কাছে পড়তে যাবে। তুমি কত কি নিবা মা? কবিতা হেসে বলে, না কাকু, টাকা লাগবে না। এ গ্রামের সবাই মোটামুটি গরিব। আমি ছেলেমেয়েদের বিনা পয়সাতে পড়াই। পারুলের ছেলে শ্রীমন্ত এক দাদার কাছে অংক শিখতে গিয়েছিল, এইমাত্র এসে পড়েছে। বই-খাতা ঘরে রেখে এসে সেও বাচ্চাদের পাশে বসে পড়ল।
এরপর নতুন অতিথির সামনে সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের পালা। শ্যামল বলল, ফারহান দাদা, আমি মুনিশ খাটা লোক। আমার স্ত্রীও মুনিশ খাটে। এখানে তেমন কাজ না জোটায় ভিন রাজ্যে চলে যাই। রাজমিস্ত্রির জোগানদারের কাজ করি। বছরে দুবার বাড়ি আসি। মাস খানিক থেকে আবার চলে যাই। শান্তনু বলল, আমি আর আমার স্ত্রী, নিম গ্রামে একটা গির্জা আছে, এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে, সেই গির্জার বাগান দেখাশোনা করি। ফিরোজ চা খেতে ভালোবাসে। পারুলের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, বৌদিদি, চা থাকলে আর একটু দাও। পারুল কেটলির তলায় যেটুকু পড়েছিল, ফিরোজের কাপে ঢেলে দিল। মিষ্টি কথাও শোনাল, জানি, ঠাকুরপো আমার চায়ের খোঁজ নেবেই। চা খেতে খেতে ফিরোজ বলে, আমি আগে খালেবিলে মাছ ধরতাম। এখন ব্যাঙ্গালোরে মার্বেলের কাজ করি। ওখানে গিয়ে চা খাওয়ার কুঅভ্যাসটা তৈরি হয়েছে। একটু বেশি চা না হলে জমে না। শ্রীমন্ত না বলে পারল না- ফিরোজ কাকা বাড়ি ফিরলে এই সময় প্রায়ই আসে আমাদের বাড়িতে। মায়ের হাতের চা না খেলে নাকি তৃপ্তি হয়না। পারুল এবার হাসতে হাসতে বলে, ছেলে আমার ঠিকই বলেছে, ফারহান দাদা। আমাদের গাঁয়ের চৌরাস্তার মোড়ে একটা ছোটখাটো চায়ের দোকান দিয়েছি আমি। ফলে ভালো করে চা বানানোর অভ্যাসটা আমার হয়েছে। পেশাদার চাবালির চা খেয়ে সবাই তৃপ্তি বোধ করে। কবিতা আর চুপ করে থাকতে পারেনা। বলে, পারুল কাকিমা চা-টা ভালো করে, অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু আমার মা-ও মশলামুড়ির মশলাটা বেশ ভালো করে তৈরি করে। বাবা বহু বছর ধরে ট্রেনে মশলামুড়ি বেচে। শুনেছি, লোকেরা চিৎকার করে হাঁক দেয় – ও চক্রবর্তী, আমাকে এক প্যাকেট দাও। ও চক্রবর্তী, আমাকে দু’পাকেট দাও। চক্রবর্তী, এদিকে তিন প্যাকেট। তাহলে বুঝুন, মশলার স্বাদ কতখানি! সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। চন্দ্রনাথ গম্ভীর গলায় বলে, গ্রামে সবাই আমরা শ্রমিক। বেশিরভাগ মানুষই ভিন রাজ্যে কাজ করে। আমি কেরলে পালিশের কাজ করি। এই সময় গ্রামে বড় মেলা বসে। যে যেখানেই থাকি, সবাই বাড়ি ফিরে আসি। কবিতা এবার বলে, কীগো দাদা, কাকু, জেঠু, করিম দাদু, আজ কি শুধু জমিয়ে গল্পই হবে না অন্য কিছুও হবে? করিম চাচা সাবলীল ভঙ্গিতে বলল, কবিতা দিদি, তুমি নিশ্চয়ই জানো, এই বৈশাখ মাস আমাদের দেশের একজন মনীষীর জন্ম মাস। দাদু, জানি আমি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মমাস। ২৫ শে বৈশাখ দিনটা চাঁদনীপুরের মানুষ কোনদিন ভুলতে পারবে না। তারপর আসবে জৈষ্ঠ মাস, নজরুল ইসলামের জন্মমাস। চাঁদনীপুরের মাটি কাউকে ভোলে না। আমরা ভুলিনি বিরসা মুণ্ডার কথা। ভুলিনি মৃত্যুপথযাত্রী জিশুর দুঃসহ বেদনা। দিদিগো, সেই বেদনার ভাগীদার হতে আমিও যে ছুটে আসি বারবার। এ যে জীবনের এক পরম সুখ। আজ এই সুখের মাঝে তোমার হৃদয়তন্ত্রীর তারে বেজে উঠুক আনন্দের সুরধ্বনি।
কবিতা গাইল জীবনের জয়গান। তারপর সভা ভাঙল। সবাই আপন আপন ঘরে ফিরে গেল। করিম চাচা ফারহানকে বলে গেল, এখানে তুমি ভালো থাকবে। জীবনের নানা দিক নতুন করে জানতে পারবে। তোমার কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা বাকি আছে। আমি অন্য একদিন সময় করে আসব। শ্রদ্ধেয় রমাকান্ত মজুমদার একজন চিন্তাশীল ব্যক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করেন। সমাজ, মানুষকে নিয়ে ভাবেন। মাটির মানুষ, সদরে থাকেন। ওঁনাকে সঙ্গে নিয়ে আসব। তুমি তো আমার সাথেই কাজ করছো। তোমাকে দিনক্ষণ জানিয়ে দেব, উঁনি কবে আসবেন।
পরদিন থেকে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করল ফারহান। দু’মাসের মধ্যে সে পুরোপুরি মিস্ত্রি হয়ে উঠল। এদিকে রেহেনা, সামাদের লেখাপড়ায়ও, ওদের কবিতা দিদির সান্নিধ্যে, বেশ উন্নতি ঘটেছে।
শ্রাবণের এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় করিম চাচা রমাকান্ত মজুমদারকে নিয়ে এলেন চাঁদনীপুরের গ্রামে। আলোচনা শুনতে উপস্থিত হয়েছে যুব, মধ্যবয়সি ও বয়স্করা। ফারহান আজ তার অজানা প্রশ্নের উত্তরগুলো জেনে নেবে। প্রশ্ন করল নির্দ্বিধায়, মানুষের জীবনে অহিংসা শ্রেষ্ঠ ধর্ম। সেই পথ কি মানুষের মুক্তির পথ নয়? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ঈশ্বর, আল্লা বা ভগবানের অস্তিত্ব কি অস্বীকার করা যায়?
রমাকান্ত মজুমদার সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলতে শুরু করলেন। “উপস্থিত সকলেই বয়সে কনিষ্ঠ বলেই মনে করছি। তবে বয়োজ্যেষ্ঠ বলে জ্ঞান-গরিমা নিয়ে আমার কোন অহংকার নেই। আমি এখানে শুধু বলতে আসিনি, তোমাদের থেকে শুনতেও এসেছি। এবার প্রশ্নের উত্তরে আসি। বিশ্ব-চরাচরে অহিংসা বলে কিছু নেই, হয় না। উদার মনের কল্পনা হতে পারে, এর বাইরে আর কিছুই নয়।” সভায় গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল, তা কী করে হয়? উঁনি তো হিংসাকে স্বীকৃতি দিলেন। হিংসা জীবনের শ্রেষ্ঠ পথ হতে পারে? “বুঝেছি, আমার কথায় তোমরা বিভ্রান্ত, অবাক হয়েছো। হবারই কথা। কিন্তু যে সত্য আমি জেনেছি, তা যে বলতেই হবে। নিয়ত পরিবর্তনশীল জগতে ভালো-মন্দ যা-ই কিছু ঘটে, সবই হিংসার ফল।” আবার গুঞ্জন – ভালোর পেছনেও হিংসা? “হ্যাঁ, একথা অনস্বীকার্য যে, গ্রহ-নক্ষত্র, সৌরজগৎ, নীহারিকা, সবার মধ্যে রয়েছে নিরন্তর সংগ্রাম। তাই আপন আপন কক্ষপথে সবাই, সবকিছু সচল থাকার লক্ষ্যে অবিচল। সংগ্রাম আছে বলেই জীবজগৎ প্রাণবন্ত, তাঁর এত সৌন্দর্য। এই সংগ্রামে হার মানলে মৃত্যু অর্থাৎ ধ্বংস অনিবার্য। আবার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অসীম মহাকাশে নতুন গ্রহ, নক্ষত্রের সৃষ্টি হয়। এভাবেই চলতে থাকে জগৎসংসারে সৃষ্টির খেলা। এক অবিরত রূপান্তরের খেলা। আমাদের রোগের বিরুদ্ধে লড়তে হয়। বেঁচে থাকার জন্য লড়তে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে হয়। প্রতিটি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে এই লড়াই। হিংস্র বাঘ তেড়ে এলে আমরা আত্মরক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করি। বিষধর সাপ তেড়ে এলে হাতে লাঠি ধরি। ঘাতক ধেয়ে এলে রুখে দাঁড়াই, প্রতিরোধ করি। আমরা জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে হোক, চলার পথে ক্ষুদ্র জীব অর্থাৎ জীবাণুদের দু’পায়ে মাড়িয়ে চলি। আমরা উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করি। এক জীব আরেক জীবের খাদ্য। বাস্তুতন্ত্রের এ নিয়ম লঙ্ঘনের উপায় নেই। অতএব, জগতে অহিংসা কথাটা সন্দেহাতীতভাবে নিরর্থক।” চন্দ্রনাথ, কবিতা, ফিরোজ একে একে প্রশ্ন তুলল, তাহলে আমরা দাবি করি কেন – যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই? হিংসা তো আরেকটি হিংসার জন্ম দেয়, তবে শান্তি আসবে কেমন করে? হিংসা কীভাবে মহৎ গুণের পরিচয় হতে পারে? রমাকান্তবাবু বলতে লাগলেন, “এসব প্রশ্ন একদিন আমার মনেও উদয় হত। তারপর একদিন ভুল ভাঙল। আসলে হিংসার পরস্পর দুটো বিপরীত রূপ আছে। একটি ক্ষতিকারক, অপরাধমূলক বা ধ্বংসাত্মক। অপরটি সৃজনশীল, গঠনমূলক অর্থাৎ শান্তির বাহক। মা তার আদরের ছেলের গালে একটি চড় মারলেন। ভালোর জন্যই চড় মারলেন। শিক্ষক ছাত্রকে বকলেন। ছাত্রের ভালোর জন্যই বকলেন। এ তো গঠনমূলক হিংসা। কিন্তু ছেলে মাকে সম্পত্তির জন্য খুন করল। কোনো দেশ পর দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য যুদ্ধ বাধাল। এসব অপরাধমূলক, ধ্বংসাত্মক হিংসা। এইরূপ হিংসা অপর একটি হিংসার জন্ম দেয়। গঠনমূলক, সৃজনধর্মী হিংসা সমাজকে সৌন্দর্য ও বিকশিত করে, জীবনে মুক্তির স্বাদ এনে দেয়। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবীরা ব্রিটিশ শক্তির বুকে আঘাত এনেছিল। তার বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা। যদিও প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি। তবুও এ লড়াই ছিল আদর্শগত। এক্ষেত্রে হিংসা ছিল গঠনমূলক। এভাবেও বলতে পারো- একটি হিংসা ন্যায়ের, অন্যটি অন্যায়ের প্রতীক। এই কারণে আমরা বিনয়-বাদল-দীনেশ, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, সুভাষচন্দ্র, আরও কতজন, এঁদের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করি। অন্যদিকে পরদেশ হরণকারী, শোষণকারী, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ রাজশক্তিকে ঘৃণা করি। একটা অচল সমাজ ভেঙে যখন নতুন সমাজ গড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, প্রবল বাধা আসে। সেখানে গঠনমূলক হিংসার সাথে ধ্বংসাত্মক হিংসার প্রবল লড়াই হয়। আসলে সেটা শুভ শক্তির সাথে অশুভ শক্তির লড়াই। অশুভ শক্তি পরাস্ত হলে পুরানো অচল সমাজের মৃত্যু হয়, নতুন সমাজ গঠিত হয়। অর্থাৎ পুরনো সমাজের রূপান্তর ঘটে নতুন সমাজে। আমি মনে করি, এখানে সকলেই আমরা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আমূল পরিবর্তনের পথে হেঁটে চলা সৈনিক।
মনে রাখতে হবে, আমুল পরিবর্তন হলেও অশুভ শক্তির কখনো বিনাশ হয় না। সুযোগ পেলে সে আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মনে হবে, হিংসা আরেকটি হিংসার জন্ম দিয়ে গেল। তা নয়। আসলে শুভ, অশুভ – এই দুই শক্তির লড়াই নিরন্তর চলতেই থাকে। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলা দার্শনিকগণ শুভ শক্তিকে ঈশ্বরের শক্তি এবং অশুভ শক্তিকে শয়তানের শক্তি বলে অভিহিত করেন। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলা দার্শনিকগণের মতে ন্যায়ের পক্ষের শক্তি হল প্রগতিশীল শক্তি, আর অন্যায়ের পক্ষের শক্তি হল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। আবার আজ যা প্রগতিশীল শক্তি, কাল তা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। কোনো একটি সমাজ প্রগতির কথা বলতে বলতে আর যখন মানুষের জন্য কল্যাণকর কিছু করতে অপারগ হয়, তখন সেই সমাজের চালিকাশক্তি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রগতিশীলতার রূপ বদলে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির জন্ম দেয়। তবে সমাজের অভ্যন্তরে বিপরীতে প্রগতির দর্জাও খুলে যায়, অত্যাচারীতের মনে নতুন সমাজের আকাঙ্ক্ষা জাগে। এভাবেই বয়ে চলে সমাজ পরিবর্তনের ধারা।”
এরপর চা পানের বিরতি। হিংসা- অহিংসা নিয়ে এখন কারও মনে আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। বিরতির পর রমাকান্তবাবু আবার বলতে শুরু করলেন। তোমরা আমাকে ঈশ্বর, আল্লাহ্ বা ভগবানের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করেছ। তিনি আছেন ধর্মপিপাসু মানুষের অন্তরে, বিশ্বাসে, কল্পনায়। এর বাইরে তিনি কোথাও নেই। প্রকৃতির নিয়মে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ম বস্তুর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে সৃষ্ট। এই নিয়মই শক্তির আধার। পৃথিবীর যত সৌন্দর্য, বৈচিত্র্য সেই শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। পৃথিবী তাঁর আপন কক্ষপথে ঘোরে, দিনরাত্রি হয়। চাঁদ আপন কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, শুক্লপক্ষ-কৃষ্ণপক্ষ, পূর্ণিমা-অমাবস্যার সৃষ্টি হয়। চাঁদকে নিয়ে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, ঋতুর বৈচিত্র্য আসে, নতুন বছরের সূচনা হয়। জল থেকে বাষ্প, বাস্প থেকে মেঘ, বৃষ্টি হয়। ঝড় ওঠে, হিম পড়ে, সুনামি, ভূমিকম্প, সবই হয় প্রকৃতির নিয়মে। আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, বেঁচে থাকা, সবকিছুই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্রিয়াফল। এই ক্রিয়া সংঘটিত হয় জৈবনিক শক্তির প্রভাবে। জৈবনিক শক্তি ফুরিয়ে গেলে মৃত্যু ঘটে, জীব জড়ে পরিণত হয় অর্থাৎ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন ঘটতেই থাকে। জগতে স্থির বলে কিছু নেই। সৌরজগৎ, আকাশপথ, নিহারিকা, কেউই স্থির নয়। নিয়ত পরিবর্তনশীল জগত এক সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। অনন্ত মহাশূন্যের পরে হয়তো আরও মহাশূন্য বিরাজমান। আজকের মানুষ সেই রহস্যের খোঁজ না পেলেও আগামী দিনের মানুষ তার সন্ধান অবশ্যই পাবে।”
ফারহান প্রশ্ন তুলল, শ্রদ্ধেয় রমাকান্তবাবু, অনন্ত মহাশূন্যের শেষ সীমার মীমাংসা আজকের বিজ্ঞান যখন করতে পারছে না, তখন তো ধর্মগুরুরা উল্লাস করতে করতে বুলবে, একমাত্র আল্লাহ্ বা ঈশ্বরই তা পারে, আর কেউ পারে না। আমাদের মতো মানুষ, যারা বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি হিসাব বোঝেনা, জানেনা, তারা তাহলে ঈশ্বর বা আল্লার অস্তিত্ব অস্বীকার করবে কী করে?
রমাকান্তবাবু বললেন, বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে শাশ্বত বলে কিছু নেই। সভ্যতার সেই আদি যুগ থেকেই ঈশ্বরের চিন্তা এসেছে মানুষের মনে। আসার কারণও ছিল। সুদীর্ঘকালের সেই বিশ্বাস এক লহমায় ভাঙতে পারে না। আপামর মানুষ যতই সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে, বিজ্ঞানমনস্ক হবে, ততই ধীরে ধীরে অন্ধবিশ্বাসের বেড়াজাল থেকে তারা মুক্ত হবে। কবিতা বলল, সেই দিন আসতে এখনো বহুকাল বাকি। ততদিন বিতর্ক চলতেই থাকবে। কেননা, এক ধাক্কায় সব মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠবে না। বহু মানুষ বিজ্ঞানের যুক্তি থেকে দূরে থাকবে, থাকতে চাইবে।
রমাকান্তবাবুও মনেপ্রাণে জানেন – ঈশ্বরে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিতর্ক এখনও বহুকাল থাকবে। তাই এ বিষয়ে তর্ক না বাড়িয়ে বললেন, থাক্ না বিতর্ক, তাতে দোষের কিছু নেই। প্রকৃত ঈশ্বরবিশ্বাসী ধার্মিক মানুষ জগতের কল্যাণের কথাই ভাবেন। সেই অর্থে একজন মানবদরদি নাস্তিক এবং মানবকল্যাণকারী ধার্মিকের মধ্যে কোনো বিভেদ থাকতে পারে না। চলার পথ ভিন্ন হলেও সমাজ বিকাশের প্রশ্নে উভয়ই একই পথের পথিক। মনুষ্যত্ব, চরিত্র গঠনের প্রশ্নে উভয়ই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এখন প্রশ্ন হল, ঈশ্বর-বিশ্বাস বিজ্ঞানচিন্তার প্রতিবন্ধক কিনা? হ্যাঁ, অবশ্যই প্রতিবন্ধক। ভূমিকম্প কেন হয়? কেউ যদি বলে, বসুন্ধরা দেবী রুষ্ট হলে হয়। মানুষের মনে এই বিশ্বাস জন্মালে কী হবে? আসল কারণ অজানা থেকে যাবে।” পারুল এরপর প্রশ্ন করে বসল, সমাজে বারবার ধ্বংসাত্মক হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে কেন? তার জন্য কি আদর্শহীন রাজনীতি দায়ী? “ঠিকই বলেছ, আদর্শহীন রাজনীতির অস্তিত্ব টিকে থাকে ধ্বংসাত্মক হিংসার উপর। তবে মানুষেরও ভূমিকা আছে। একজন মানুষ তিনি যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেন, অর্থাৎ ঈশ্বর নেই – এটা তাকে ভাবিয়ে তোলে যে, তাহলে তো পাপ-পুণ্যের তত্ত্বটা মিথ্যা, পাপ বলে কিছু নেই। তিনি তখন অমানুষ ওঠেন। নীতি-নৈতিকতা, মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে অন্যায় কার্যে লিপ্ত হয়ে পড়েন। চরিত্র বলে তার মধ্যে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। আবার একজন ঈশ্বরবিশ্বাসী মানুষ যদি মনে করেন – একবার ঈশ্বরের নামে যত পাপ হরে, জীবের কি সাধ্য আছে, তত পাপ করে? তিনিও তখন আড়ালে-আবডালে অথবা ভণ্ড তপস্বীর বেশে ঈশ্বরের গুণগান করতে করতে অমানুষ হয়ে ওঠেন। ভয় কী? অন্যায় করে ঈশ্বরের নাম করলেই তো সমস্ত পাপ ধুয়ে-মুছে যাবে। এই দু’ধরনের মানুষের সংখ্যাই সমাজে এখন বেশি। স্বার্থান্বেষী শাসক এদের মাথায় হাত রাখলে এবং সমাজ, দেশ পরিচালনার রশি এদের হাতে চলে গেলে মহা বিপদ। সমাজে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। অতএব, চাই প্রকৃত শিক্ষা। আমাদের কর্তব্য হল – এই অন্ধকারময় সমাজে আলো জ্বালানো। নতুন ঊষার আলো। সেই আলোয় মানুষ খুঁজে পাবে সত্যের পথ। এখানে উপস্থিত সকলেই শ্রমিক। বেশিরভাগই পরিযায়ী শ্রমিক। সকলেরই কষ্টে দিন কাটে। মনে রেখো, যুগে যুগে নিরন্ন, নিপীড়িত, মেহনতী মানুষেরাই পুরানো অচল-অসাড় সমাজ ভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়েছে। তবু আজও মানুষের মুক্তি আসেনি। চাই ঐক্যবদ্ধভাবে কঠিন ও কঠোর সংগ্রাম। জীবনে চাই ত্যাগের আদর্শ। সমাজের থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু নেওয়া নয়, বরং সমাজকে আরও বেশি দিতে হবে। তবেই জীবনের স্বর্গরাজ্য গড়ে উঠবে।”
ফারহান উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইল, সেই স্বর্গরাজ্য সত্যিই কি গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে ধনী গরিবের টাকা লুঠ করে আরও ধনী হতে চায়, গরিব সব হারিয়ে আরও নিঃস্ব হয়? ফারহান, এটাই হল ধনতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য, আর বর্তমানে সেই সমাজেই আমরা বাস করি। শ্রমজীবী মানুষকেই এ সমাজ ভাঙতে হবে, গড়তে হবে স্বর্গরাজ্য। ক্রমঃবিকাশের পথে সেই স্বর্গরাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব। সেই দিন একদিন আসবেই। তবুও অনাগত ভবিষ্যতের সেই সুদিন কবে আসবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারি না। যেটা বলা সম্ভব, তা হল – সেই দীর্ঘ পথের বাঁকে বাঁকে পেরোতে হবে অনেক বাধা-বিপত্তি।”
…………………………………………………….