| (গোয়েন্দা গল্প) |
| কুয়াশা সরিয়ে | – হরবিলাস সরকার |
শহরের কেন্দ্রস্থল ‘লালদীঘি’র পূর্ব পাড়ের সৌন্দর্যশোভিত চারতলা বাড়িটা জুড়ে এখন গভীর বিষাদের কোলাহল। বাড়ির একমাত্র ছেলে ধীমান, ধীমান রায়চৌধুরী। আজ সকালে তার নববধূর নিথর দেহ মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেছে। মাস তিনেক আগে বিয়ে হয়েছিল।
ধীমান বাড়িতে নেই। গতকাল ব্যবসায়িক প্রয়োজনে মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। বিকেল পাঁচটার ট্রেন ধরে কলকাতা। সেখান থেকে রাত বারোটার ফ্লাইট।
বাড়ির পরিচারিকা ‘কাজলি’ নিত্যদিনের মতোই আজও ভোর ছটায় কাজে এসেছিল। দোতলায় উঠে মূল দরজা দিয়ে ঢুকে ডাইনিং। ডাইনিংয়ের একদিকে ধীমানের ঘর, অন্যদিকে তার বাবা-মায়ের ঘর। কিন্তু আজ মূল দরজাটা, ভেতরের ফ্লেক্সিবল গেট দুটোই খোলা দেখে কাজলি বেশ অবাক হয়েছিল। কেননা, প্রতিদিন তো তাকে কলিংবেল বাজিয়ে দরজা খোলাতে হয়, তবে আজ কেন খোলা?
যাইহোক, বার দুয়েক কেশে নিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল কাজলি। ধীমানের বাবা-মা তখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। বরাবরই তারা একটু দেরি করে ওঠেন। বৌদিমণির ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা ছিল। কাজলি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়েছিল সেদিকে। ‘বৌদিমণি’ বলে হাঁক দিয়ে দরজার ওপাড়ে পা ফেলতেই সে ভয়ানক দৃশ্য দেখতে পেয়েছিল। চিৎকার করে উঠেছিল। ওপাশ থেকে ঘুম-চোখে দরজা খুলে ধীমানের বাবা-মা উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে এসেছিলেন। তিনতলা ও চারতলার দুই ভাড়াটে পরিবারের লোকেরাও ছুটে এসেছিলেন।
তারপর সকালের সোনালি সূর্যটা যেন ম্লান হয়ে ফুটে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ আসে বাড়িতে। বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিষ্ট ডাক্তার কাঞ্জিলাল সহ ফরেন্সিকের লোকেরা এলেন জরুরি ভিত্তিক খবর পেয়ে। ডাক্তার কাঞ্জিলাল দেহটাকে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, মৃত। পুলিশ মৃত্যুর কারণ জিজ্ঞেস করলে ডাক্তারবাবু বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, কেমন যেন একটু অদ্ভুত লাগছে। শরীরে আঘাতের কোন চিহ্ন নেই, ধস্তাধস্তির কোন চিহ্ন নেই। যেন স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে আছে অথচ মৃত। অতপর মৃতদেহের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে তিনি সদলবলে চলে গেলেন।
ধীমানের বাবা নিদারুন খবরটা ফোন করে ছেলেকে জানালেন। ধীমান কান্নায় ভেঙে পড়ল। বলল, বাবা, আমি ফিরে আসছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
বৈশাখের বেলা ক্রমে বাড়তে বাড়তে দুপুর। তীব্র দাবদাহ উপেক্ষা করে বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। আত্মীয়-স্বজনেরা একে একে চলে এসেছেন। গৃহবধূর বাবা-মা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। বিকেল চারটে নাগাদ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এল। জানা গেল, অত্যধিক পরিমাণে ক্লোরোফর্ম দিয়ে মৃত্যু সংঘটিত করা হয়েছে। আর তা করা হয়েছে রাত এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে।
কিন্তু কে বা কারা ঘটালো এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা? কেনই বা ঘটালো? এসব প্রশ্ন এখন সকলের। বিকেল পাঁচটার কিছু পরে ধীমান বাড়ি ফিরে এল। স্ত্রীর নিথর দেহের পাশে বসে অঝোরে অশ্রু ঝরাতে লাগল। শ্রেয়সী, দুদিনের জন্য এসেছিলে, কেন এসেছিলে? আমি যে বড় একা হয়ে গেলাম। এই বুঝি আমার ভাগ্যে লেখা ছিল! …………..!
শ্রেয়সীর বাবার ফোন পেয়ে ইতিমধ্যে বিশিষ্ট গোয়েন্দা ত্রিলোচন ত্রিপাঠী দু’জন সঙ্গীসহ এসে হাজির হয়েছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট খতিয়ে দেখে মৃতদেহের আশপাশ ভালো করে দেখে নিলেন। ডায়েরিতে কী সব লিখে নিলেন। তারপর মৃতদেহের দিকে কিছুক্ষন এক নজরে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করলেন, মৃতদেহকে প্রথমে কে দেখেছে? ধীমানের বাবা উত্তর দিলেন, বাড়ির পরিচারিকা। পরিচারিকা? আগে বাড়ির লোকেদের চোখে পড়ল না কেন? ধীমানের মা বললেন, প্রতিদিন আমাদের ঘুম থেকে ওঠার আগেই কাজলি চলে আসে। গোয়েন্দা এবার মূল দরজাটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। কয়েকটা ছবিও সংগ্রহ করলেন। তিনতলা, চারতলার সিঁড়িগুলোতে পায়ের ছাপের ছবি তুললেন। বাড়ির চারপাশে, পরিত্যক্ত বর্জ্যের মধ্যে কিছু একটা খোঁজাখুঁজি করলেন। শেষে কাল সকালে আবার আসব এবং পরিচারিকা যেন অবশ্যই হাজির থাকে, এই বলে চলে গেলেন।
পুলিশ এবার মৃতদেহের সৎকারের জন্য তৎপর হয়ে উঠল। শুরু হল শবযাত্রা। কাজলি আজ সারাদিন এ বাড়িতেই ছিল। সন্ধ্যার আগে ধীমানের শোকাহত মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে চোখের জলে নিজের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হল। ধীমান তখনও শ্মশান থেকে ফিরে আসেনি।
পরদিন কথামতোই গোয়েন্দা ত্রিলোচন ত্রিপাঠি এলেন মৃত্যুরহস্য উদঘাটন করতে। ধীমান ও তার মা-বাবাকে একসাথে বসিয়ে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদের পর সকলকে বলা হল ঘর ছেড়ে চলে যেতে। ডাকা হল কাজলিকে। কাজলি শোকে ম্রিয়মাণ। প্রশ্ন ধেয়ে এল। তুমি কতদিন ধরে এ বাড়িতে কাজ করছো? বহু বছর ধরে, স্যার। আমার ছেলেটা তখন সবে হাঁটা ধরেছে। এখন ওর বয়স ১৮-১৯ হবে। এ বাড়ির লোকেরা কেমন? খুব ভালো, তা নাহলে এতদিন ধরে আমি কাজ করতে পারতাম না। গত পরশুদিন অর্থাৎ ২৯ এপ্রিল, মঙ্গলবার বিকেলে তুমি কখন কাজে এসেছিলে, কখন ফিরে গিয়েছিলে? স্যার, বিকেল নয়, সন্ধ্যার একটু আগে এসেছিলাম। কাজ সারতে আমার ঘন্টাখানিক লাগে। ধীমানবাবুর সাথে তোমার দেখা হয়েছিল? না। ছোটবাবুর সাথে আমার দেখা হয়নি। ছোটবাবু? ধীমানবাবুকে ছোটবাবু বলেই ডাকি। ওনার বাবাকে বড়বাবু বলি। এ বাড়িতে যখন প্রথম কাজে আসি, ধীমানবাবু তখন ১৫-১৬ বছরের ছেলে। সেদিন কাজ সেরে চলে যাবার সময় কে এসেছিল মূল দরজা বন্ধ করতে? বৌদিমণি। বড়বাবু আর মাসিমা ডাইনিংয়ে বসে চা খাচ্ছিলেন। ঠিক আছে, তুমি চলে যাও।
ধীমানবাবুকে আবার ডাকা হল। ত্রিলোচনবাবু প্রশ্ন করলেন, আপনি কাউকে সন্দেহ করেন? না স্যার। আপনাদের পরিচারিকাকে? না স্যার। ঘরের কোন মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে? না স্যার। আপনার শ্বশুর বাড়ির ঠিকানাটা বলুন। প্রিয়নাথ ঘোষাল, আমার শ্বশুরমশাই। ৪৯, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী রোড, কান্দি, মুর্শিদাবাদ। ও কে। পরে আবার দেখা হবে।
গোয়েন্দা ত্রিলোচনের গাড়ি ছুটল কান্দির উদ্দেশে। আধঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলেন সেখানে। মুখোমুখি বসলেন প্রিয়নাথ ঘোষাল এবং তার স্ত্রীর। আপনাদের মেয়ের শ্রেয়সীর মৃত্যুর পেছনে জামাই ধীমান রায়চৌধুরীর কোন হাত আছে বলে মনে করেন? এ আপনি কী বলেন! ধীমান খুব ভালো ছেলে। আমার মেয়েকে খুব ভালোবাসতো। মেয়েও ধীমানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। ধীমানের বাবা-মাও অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমার মেয়েকে তো নিজেদের মেয়ের মতোই দেখতো। দেনা-পাওনা নিয়ে ধীমানের কোনো দাবি ছিল বা কোনো দাবি অপূর্ণ ছিল? না স্যার। ওরা পনের কথা মনেও ভাবেনি। শ্রেয়সীর মা বললেন, জামাইয়ের কয়েক কোটি টাকার ওষুধের ব্যবসা। বংশপরম্পরায় বনেদি পরিবার, ওষুধেরই ব্যবসা। তাছাড়া শ্রেয়সী আমাদের ছোট মেয়ে। ওর কোন চাহিদায় আমরা অপূর্ণ রাখিনি। শুন্য হাতে ফিরতে হল গোয়েন্দাকে।
দিনকয়েক পর ফরেন্সিক পরীক্ষার যা রিপোর্ট হাতে এল, তাতে হতাশ হয়ে পড়লেন ত্রিলোচনবাবু। তাঁর সহযোগী প্রকাশ আর রজনীশকে বললেন, কেসটার কুল-কিনারা কিছুই খুঁজে পাচ্ছিনা রে। বোধ হয় এবার আমাকে হার মানতেই হবে। প্রকাশ অবাক হয়ে বলল, স্যার, আপনি তো হতাশ হবার মানুষ নন। ত্রিলোচনবাবু নিরাশার হাসি হাসলেন। রজনীশ বলল, স্যার, খুনি দরজা বা জানালা ভেঙে ভেতরে ঢোকেনি। তাহলে খুনি ঢুকল কীভাবে? তাহলে কি খুনি আগে থেকেই ভেতরে ঢুকে লুকিয়েছিল? প্রকাশ বলল, দরজা দুটো হয়তো ভুল করে সেদিন লাগানোই হয়নি। আর কাকতালীয়ভাবে খুনিও সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ফেলেছে। না রে। ধীমানবাবুর বাবা সে রাতে নিজের হাতে মূল দরজা লাগিয়েছিলেন। আর ধীমানবাবুর মা ঘুমোতে যাবার আগে ডাইনিং সংলগ্ন ফ্লেক্সিবল গেটে তালা মেরেছিলেন। তাছাড়া দরজাগুলোয় বাড়ির লোকের ছাড়া বাইরের কারও হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি। এখন প্রশ্ন হল, খুনি যদি বাইরের হয় তবে সে কে? শ্রেয়সীকেই বা খুন করবে কেন? প্রেমে ব্যর্থ হওয়া কোনো প্রেমিক না ধীমানবাবুর ঠকানো কোনো প্রেমিকা? হাজার প্রশ্ন এখন ত্রিলোচনবাবুর মাথায়।
ওদিকে ধীমানবাবু স্ত্রী-বিয়োগ ব্যথায় বড়ই কাতর হয়ে পড়েছেন। বারবার ফোন করে ত্রিলোচনবাবুকে বলছেন, আপনি শ্রেয়সীর খুনিকে খুঁজে বের করুন। ওই পাষণ্ডর চরম শাস্তি হলে আমার মন শান্তি পাবে। ধীমানবাবুর মা-বাবাও একই কথা বলছেন।
শ্রেয়সীর মা-বাবাও একদিন ত্রিলোচনবাবুর অফিসে এসে কান্নাকাটি করে গেছেন।
ত্রিলোচনবাবু গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। কিছু একটা ভেবে সহযোগীদের নিয়ে চলে এলেন ধীমানবাবুর বাড়ি। গোটা ভূমিতল জুড়ে তার কর্মস্থল, ওষুধের ব্যবসা। ঘরগুলির আনাচকানাচ তল্লাশি করলেন। কর্মচারীদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিলেন। এরপর নিকটবর্তী থানায় গেলেন। নাঃ, ইতিপূর্বে ধীমানের বিরুদ্ধে কারও কোন অভিযোগ নেই, কারও সঙ্গে কোন শত্রুতাও নেই। ছিটেফোঁটা ক্লুও পাওয়া গেল না। ফিরে এলেন নিরাশ হয়ে। বিকেলে সহযোগীদের পাঠালেন শ্রেয়সীর বাপের বাড়ির এলাকায়। প্রেম-ভালোবাসা জনিত কোন খবর উঠে আসে কিনা। কিন্তু সহযোগীরা ফিরে এল শূন্য হাতে।
এক সকালে ত্রিলোচনবাবু অফিসে বসে চা খাচ্ছেন। প্রকাশ হন্তদন্ত হয়ে কোথা থেকে এল। সে ফ্লাক্স থেকে চা ঢালতে ঢালতে কবিতার পংক্তি আবৃত্তি করতে লাগল। যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন। ইতিমধ্যে রজনীশও চলে এসেছে। জিজ্ঞেস করল, কেন রে, তুই কি কোন হারানো রতন খুঁজে পেয়েছিস? হ্যাঁ, পেয়েছি। কী পেয়েছিস, একটু খুলে বলতো। ত্রিলোচনবাবুও শোনবার জন্য উদগ্রীব। জানেন স্যার, আমার জামার পকেট থেকে ১০০ টাকার একটা নোট খোয়া গেছিল। আমি নিশ্চিত ছিলাম, টাকাটা পকেটেই ছিল। বাড়ির কাজের মেয়েকে মিছেমিছি দোষ দেওয়া হল। শেষে টাকাটা পাওয়া গেল আমার ভাইয়ের ব্যাগ থেকে। খুব ভালো ছেলে। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এমন কাজ আগে কখনও করেনি। ওর প্রতি কোন সন্দেহও হয়নি। তবু ব্যাগটা আমি তল্লাশি করলাম।
ত্রিলোচনবাবু যেন একটু আশার আলো দেখতে পেলেন। চললেন আবার ধীমানবাবুর বাড়ি। পথে সহযোগীদের বললেন, কে খুনি, আমাদের জানার প্রয়োজন নেই। কে দরজা খুলেছিল, তাও জানার প্রয়োজন নেই। শুধু জানতে হবে, ক্লোরোফর্মের শিশিটা কোথা থেকে এল, কোথায় গেল, তাহলেই বাকি সবকিছু জানা যাবে।
ঘড়ির কাঁটায় বেলা দশটা। ধীমানবাবু আজ সকাল সকাল একতলায় তার ব্যবসা-ক্ষেত্রে চলে এসেছেন। কাঁচের দেওয়ালে ঘেরা তাঁর অফিস ঘরে বসে এক ভদ্রমহিলার সাথে বেশ ফুরফুরে মেজাজে কথা বলছেন। ত্রিলোচনবাবু আড়াল থেকে সব লক্ষ্য করছেন। ফিসফিস করে সহযোগীদের বললেন, এইতো সেদিন স্ত্রীশোকে কাতর ছিলেন। আজ তার লেশমাত্রও নেই। প্রকাশ, তুমি ভেতরে গিয়ে ম্যানেজারবাবুর কাছে খোঁজ নাও। একটু কায়দা করে জানার চেষ্টা কর, ওনারা কতগুলো কোম্পানির সাথে ডিল করেন, আর প্রোডাক্টের মধ্যে ক্লোরোফর্ম আছে কিনা। রজনীশ, তুমি গিয়ে ওই মহিলার ব্যাপারে জানার চেষ্টা কর। আমি বাইরে গাড়িতে থাকব।
কিছু সময় পরে প্রকাশ এসে খবর দিল, স্যার, রায়চৌধুরী মেডিকেল হল কুড়িটা কোম্পানির সাথে ডিল করে। এগুলোর মধ্যে একমাত্র অজন্তা ফার্মা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি, মুম্বাই ক্লোরোফর্ম তৈরি করে। রজনীশ এসে একটা চমকপ্রদ খবর দিল, স্যার, মহিলা একটি মেডিসিন কোম্পানির চিপ এক্সিকিউটিভ অফিসার, নন বেঙ্গলি। হিন্দি, বাংলা মিশিয়ে কথা বলছিলেন। দুটো টুকরো কথা কানে এসেছে। আপকা ফিনিশিং বহুৎ আচ্ছা। এখন আর কোন বাধা রইল না। যাক্, তোমরা যা শোনালে, তাতে মনে হয় আমি কিনারাটা অনেক দূর থেকে একটু একটু হলেও দেখতে পাচ্ছি। চলো, আজ আর নয়, কাল তোমাদের আবার ছদ্মবেশে আসতে হবে। অজন্তা ফার্মা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির দায়িত্বে থাকা গুরুত্বপূর্ণ রিপ্রেজেন্টেটিভ সেজে। ধীমানবাবুকে বলবে, আপনার লাস্ট পেমেন্ট বাকি আছে। ওটা না দেওয়া পর্যন্ত নতুন অর্ডারের প্রোডাক্ট সাপ্লাই করা যাচ্ছে না।
পরদিন ছদ্মবেশে এসে হাজির হলো প্রকাশ আর রজনীশ। একজন বাংলাভাষী, আরেকজন হিন্দীভাষী। কাজও হাসিল হয়ে গেল। ত্রিলোচনবাবু গাড়ি নিয়ে এসে বাইরে অপেক্ষা করছেন, একথা জানা ছিল না দুই সহযোগীর। প্রকাশ হঠাৎ চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল, স্যার, আপনি এখানে? আগে গাড়িতে ওঠ, তারপর কী জেনেছো, বল। গাড়িতে উঠে প্রকাশ বলতে শুরু করল, স্যার, প্রথমে ধীমানবাবু তো আকাশ থেকে পড়লেন। মেজাজ দেখালেন, কে বলল আপনাদের? রজনীশ এবার বলতে লাগল, স্যার, আমি ধীমানবাবুকে বললাম, স্যার প্লিজ, ধ্যান সে ফাইল কো একবার দেখ লিজিয়ে না। উনি বললেন, না না এক পয়সাও বাকি নেই। গতকাল ম্যাডাম সুনীতা আগরওয়াল এসেছিলেন। উনি নিজে বলে গিয়েছেন, অর্ডারের সমস্ত প্রোডাক্ট দু-একদিনের মধ্যে চলে আসবে। উনি এই শহরেই আছেন। আজও ওনার এখানে আসার কথা আছে। আমরা অনন্যোপায় হয়ে ক্ষমা চেয়ে পালিয়ে এসেছি। ত্রিলোচনবাবু মৃদু হেসে বললেন, তাহলে ভদ্রমহিলা অর্থাৎ সুনীতা আগরওয়াল অজন্তা ফার্মা প্রাইভেট লিমিটেডের চিফ এক্সিকিউটিভ, আমি নিশ্চিত। রজনীশ কৌতুহলে প্রশ্নটা না করে পারল না, স্যার, ধীমানবাবুর স্ত্রীর খুনের সাথে সুনীতা আগরওয়ালের কী সম্পর্ক? কৌতুহলটা চেপে রাখো। জানালার কাঁচগুলো নামিয়ে দাও। ঐ দেখ, উনি এসে গেছেন। একটু পরেই জানতে পারবে। হ্যাঁ স্যার, ম্যাডাম নামছেন গাড়ি থেকে। প্রকাশ জিজ্ঞেস করল, এখন স্যার কী করবেন? একটু অপেক্ষা করতে হবে।
কিছু সময় পর ধীমানবাবু এবং ম্যাডাম আগরওয়াল পাশাপাশি বেশ উল্লসিত মনে বেরিয়ে এসে গাড়িতে চাপলেন। গাড়ি চলতে শুরু করল। ত্রিলোচনবাবু ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন, গাড়িটাকে ফলো কর।
গাড়ি শহরের প্রায় শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল বিলাসবহুল হাভেলি রেস্তোরাঁর সামনে। পেছনে ত্রিলোচনবাবুর গাড়ি। ধীমানবাবু এবং মহিলা গাড়ি থেকে নেমে ঢুকে পড়লেন ভেতরে। প্রকাশ,রজনীশ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ত্রিলোচনবাবু বললেন, আজ রহস্যের দরজাটা খুললেও খুলে যেতে পারে। হয়তো কিনারার কাছাকাছি আমরা এসে গিয়েছি। মেকআপ বক্সটা খোল। সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
তিনজন ভিআইপির ছদ্মবেশ ধারণ করে হোটেলে ঢুকলেন খদ্দের সেজে। লিফটে করে সোজা উঠে গেলেন তিনতলায় সুরক্ষিত ভিআইপি কক্ষে। ধীমানবাবু আর মহিলা বসেছেন, ঠিক তার পাশের টেবিলে বসলেন। কিছু অর্ডার করলেন। খেতে খেতে শুনছেন ওদের কথা। সুনীতা, এই একটা মাসে তুমি আমাকে বদলে দিয়েছো, যা আমার কল্পনার অতীত ছিল। ধীমান, আমাদের একটু সংযত হয়ে কথা বলতে হবে। আশেপাশে গুপ্তচর থাকতে পারে। ভাবছি, রিপ্রেজেন্টেটিভ সেজে সেদিন কারা তোমার অফিস-রুমে এসেছিল? যদিও ক্ষণিকের অবসানেই নতুন বসন্তের আবেশে দুটো মনই অধৈর্য হয়ে উঠল। ধীমান, গোপনে রেজিস্ট্রি ম্যারেজটা তাড়াতাড়ি সেরে নাও। তুমি তো জানো, অজন্তা ফার্মা প্রাইভেট লিমিটেডের অর্ধেক মালিকানা আমার। তোমাকেও শেয়ার করে নেব। সুনীতা, সে তো নাহয় হবে। তার আগে চলো, দীঘায় দু’টো দিন কাটিয়ে আসি। কবে যাবে? ও, ভালো কথা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, শিশিটাকে বাড়ির আশেপাশে বা ডাস্টবিনে ফেলোনি তো? মাথা খারাপ! যেখানকার জিনিস, সেখানেই রেখে দিয়েছি। জায়গাটা সন্দেহের বাইরে। মেডিসিনের তাকে? ফাইন!
কথোপকথন রেকর্ড হয়ে গেল ত্রিলোচনবাবুর মোবাইলে। তিনি ফিরে এলেন সহযোগীদের নিয়ে গাড়িতে। ছদ্মবেশ খুলে ফেললেন। দূরভাষ অধিকর্তাকে কিছু একটা হোয়াটসঅ্যাপ করে পাঠালেন। গন্তব্য এবার সোজা ধীমানবাবুর ব্যবসা-স্থল। অজন্তা ফার্মার শেল্ফ কোথায়? আমি গোয়েন্দা ত্রিলোচন ত্রিপাঠি। সমস্ত প্রোডাক্ট দেখবো। ম্যানেজার দেখিয়ে দিলেন। ত্রিলোচনবাবু নির্দেশ দিলেন, যাও প্রকাশ, রজনীশ, ক্লোরোফর্মের ব্লাঙ্ক শিশিটা খুঁজে বের কর।
শিশিটা খুঁজে পাওয়া গেল। জরুরি ভিত্তিতে সেটাকে ফরেন্সিকে পাঠানো হল। পুলিশকেও খবর দেওয়া হল। শ্রেয়সীর বাবার বাড়িতেও খবর দেওয়া হল দ্রুত আসার জন্য।
ঘন্টা দু’য়েক পরে ধীমানবাবু ম্যাডামকে নিয়ে ফিরে এলেন। গোয়েন্দাকে দেখে চমকে উঠলেন। পুলিশের গাড়িও এসে পড়েছে। শ্রেয়সীর বাবা-মাও চলে এসেছেন। এইমাত্র ফরেন্সিকের টেস্ট রিপোর্টও হাতে পাওয়া গেল। ত্রিলোচনবাবু গোল গোল চোখ করে অপরাধীদের দিকে তাকালেন। মিস্টার ধীমান, মিসেস সুনীতা, আপনাদের খেল খতম। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই চরম সত্য। এই সেই ক্লোরোফর্মের শিশি, যে ক্লোরোফর্ম দিয়ে আপনি আপনার স্ত্রীকে হত্যা করেছেন, এই নারীর প্রলোভনে পড়ে। শিশির গায়ে আপনার আঙ্গুলের ছাপ মিলে গেছে। কীভাবে করলেন, বলবেন না আমি বলব? ধীমানবাবু কেঁদে ফেললেন।
বেশ, আমিই বলছি। ধীমান, আপনি মাসখানিক আগে মিসেস সুনীতা আগরওয়ালের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অবশ্য উনিও এটাই চেয়েছিলেন। মিসেস সুনীতা বিবাহবিচ্ছিন্ন মহিলা এবং অজন্তা ফার্মা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির অর্ধেক সম্পত্তির মালিক। আপনি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন। সুনীতাদেবীকে পাওয়া এবং বিশাল প্রপার্টির মালিক হওয়া। কিন্তু সরিয়ে ফেলতে হবে শ্রেয়সীদেবীকে। সুযোগ এসে গেল হাতের মুঠোয়। আপনি যেদিন মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, সেদিন পথেই জানতে পারেন, কোলকাতা থেকে ফ্লাইট রাত বারোটার বদলে পরদিন ভোর ছটায় ছাড়বে। হাতে পাঁচ ঘন্টা সময় পেয়ে গেলেন। শিয়ালদহগামী ট্রেন থেকে পরবর্তী স্টেশনে নেমে পড়েন এবং আপ লোকাল ধরে বহরমপুরে ফিরে আসেন। রাতের অন্ধকারে আপনি চুপিচুপি বাড়ি ঢোকেন। মেডিসিনের ঘর খুলে শেল্ফ থেকে ক্লোরোফর্মের একটা শিশি নিলেন। তারপর দোতলায় উঠে কলিংবেল বাজালেন না। ফোন করে স্ত্রীকে বললেন, দরজা খুলে দাও। ফ্লাইট ক্যান্সেল, আমি ফিরে এসেছি। ফোনের কল রেকর্ড আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। কলিং বেলটা বাজালেন না এই কারণে যে, যদি আপনার মা-বাবা জেগে ওঠেন। যাইহোক, আপনার স্ত্রী এসে দরজা খুলে দিলেন। আপনি দুটো দরজাই বন্ধ না করে অর্থাৎ না ছুঁয়ে পেছন পেছন ভেতরে ঢুকলেন। ক্লোরোফর্মের শিশিটা খুলে স্ত্রীর নাকে ধরলেন। উনি মেঝের উপরেই জ্ঞান হারালেন। অত্যধিক পরিমাণে ক্লোরোফর্ম দেওয়ায় আসলে চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হলেন। একটা ফুলের মতো জীবন এভাবেই আপনি শেষ করে দিলেন। তারপর আপনি সন্তর্পণে বেরিয়ে এসে যথাস্থানে শিশিটা রাখলেন তারপর পুনরায় রওনা হলেন মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে। পাপ করলে প্রায়শ্চিত্ত করতেই হয়। অফিসার, অ্যারেস্ট মিস্টার ধীমান এন্ড মিসেস সুনীতা।
…………………………