উপন্যাস
মোসলেমা চলে গেলে ফারহান আবারও স্বপ্নের কথা ভাবতে লাগল। বেলা দশটা নাগাদ রবিউল ফোন করে ডাকল, ফারহান ভাই, একটু তাড়াতাড়ি আসিও আজ। তোমাকে নিয়ে বেরুবো। ফারহান মন খারাপ করে বসেই ছিল। ভাবল, আজেবাজে দুশ্চিন্তা আইসা মাথাটারে আরও খারাপ করে দিবে। তার চেয়ে বরং রবিউল ডাকছে যখন, এখনই কারখানায় চইলা যাই। এমনটা ভেবে দুশ্চিন্তার বোঝাটা ঝপাৎ করে নামিয়ে সে সোজা চলে এল কারখানায়। বাইরে পাহারাওলা মতিউর চেয়ারে হেলান দিয়ে বিড়ি টানছিল। বলল, আজ এত আগে কেনে ফারহান ভাই? সময়ের আগে ভেতরে ঢোকা মালিকের বারণ আছে। এখনও কেউ আসেনি গো। না মতিউর ভাই, মালিকই আমাকে একটু আগে আসতে বুলেছে। তবে অনেকটাই আগে আইসা পড়িছি। মতিউর ইশারায় বোঝাল – যাও তাহলে। ভেতরে ঢুকে ফারহান রবিউলের অফিস ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে রুমেলার হাসির শব্দ শুনতে পেল। দরজার ফাঁক গলে দেখল – রুমেলা রবিউলের গলা ধরে ঝুলে পড়ে বলছে, তোমার মনোবাঞ্ছা আমি কখনও অপূর্ণ রাখিনি। বিনিময়ে আমি কিছুই চাইনি। আজ যদি কিছু চাই, দিবে? কী চাও, বুলো। সামনের বছর পঞ্চায়েত ভোট। মেম্বরের একটা টিকিট আমাকে দিতে হবে। কথা দিলাম, তোমার টিকিট একেবারে পাকা। ……..।
ফারহান ঘেন্নায় বাইরে বেরিয়ে এল। ভাবতে লাগল, সমাজে এক শ্রেণির লোক আছে, যাদের টাকাপয়সা আর ক্ষ্যামতার জোর আছে, বেশভূষায় নামী-দামি সম্মানীয় ব্যক্তি বইলা মনে হয়, তাদের ভোগের লালসার অন্ত নাই। আর এক শ্রেণির নারী আছে, তারা রূপের ছটায় ফাঁদ পাতে, নিজ স্বার্থকে চরিতার্থ করতে নির্দ্বিধায় ইজ্জতও বিলাইতে পারে। ফারহান নিজেকে অপরাধী ভাবে, মনে মনে বলে, আমি এক নিরুপায়, অধম, গরিব মানুষ, পেটের দু’মুঠো আহার জোগাতে নিত্য এই পাপিষ্ঠ লোকদেরকে সেলাম করি। হে আল্লা, তুমি আমাকে ক্ষমা কইরা দিও। ……। এরপর একখান চেয়ার টেনে মতিউরের পাশে চুপচাপ বসে পড়ল।
সময় হলে একে একে কর্মীরা এসে ঢুকতে লাগল। একটু পরে রবিউল বাইরে বেরিয়ে মোটর বাইকে স্টার্ট দিল। ফারহানকে পেছনে চাপতে বললে সে জানতে চাইল, কোথায় যাইবা ভাই? উঃ প্রশ্ন কর কেনে? দেখতেই পাইবা – কোতি যাচ্ছি।
বাইক এসে থামল গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুলের দরজায়। মাঝ বয়সি হেড টিচার তাঁর কক্ষে বসে খাতাপত্রের কাজ সারছিলেন। রবিউল ‘মাস্টার শুনেন’ বলে হাঁক দিতেই মাস্টেমশায় সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এলেন। এলাকার মেম্বর বলে কথা, তার উপর দলের দাপুটে নেতা। এটুকু সম্মান না জানিয়ে উপায় আছে? রবিউল চোখে চোখ রেখে বলল, আপনার স্কুলে সাত লাখ টাকা অনুদান এসেছে। আমি নির্বাচন ফান্ডে দু’লাখ টাকা নেব। এক সপ্তাহের মধ্যে দিতে হবে। সময় মতো দু’লাখ টাকার বিল আমি বানিয়ে দেবো। মাস্টেমশায়ের চক্ষু স্থির হয়ে গেল। ওই টাকায় ঘর তৈরি হবে। আপনাদের গাঁয়ের ছেলেমেয়েরাই স্কুলে পড়ে। ওদের বসতে দিতে পারি না। পর্যাপ্ত ঘর নেই। না বসতে পারলে লেখাপড়া শিখবে কী করে? রবিউল ধমক দিয়ে বলল, আপনাকে লেখাপড়া শেখাতে কে বুলেছে? আপনাদের কাজ হল – আসবেন, হাজিরা দিবেন, বাচ্চাদের মিড-ডে-মিল খাওয়াবেন, ব্যস, তারপর বাড়ি চলে যাবেন। এতটা অসম্মান সহ্য করেও মাস্টেমশায় মিষ্টি হেসে বললেন, মেম্বর সাহেব,কী যে বলেন! মাস্টার, বেশি চালাকি করবেন না। ভালো থাকতে চান নাকি চান না? চললাম, কথার যেন নড়চড় না হয়। মাস্টেমশায় মাথা নাড়িয়ে ভেতরে চলে গেলেন।
বাইকে স্টার্ট দেয় রবিউল। গন্তব্য এবার অন্য স্কুল। ফারহানের মুখখানা শুকিয়ে যায়। এই স্কুলেই তো তার ছেলেমেয়েরা পড়ে। বাইকের পেছনে বসে ভাবে, যত গরিব হতভাগার ছেলেমেয়েরাই সরকারি স্কুলে পড়ে। ওদের ভবিষ্যৎ বড়ই অন্ধকার।
আজ বিকেলে পাড়ায় আবার নৃশংস পৈশাচিক দুটো ঘটনা ঘটে গেল। বড় ভাই হায়দার, ছোট ভাই নুরুল আর তাদের আম্মার মধ্যে জমি বন্টন নিয়ে বিবাদ। নুরুল আম্মাকে দেখে না। আম্মাও তাই রাগ করে দু’বিঘা ফসলের জমি বড় ছেলেকে লিখে দিয়েছে। এই নিয়ে বিবাদ আজ চরমে উঠলে নুরুল ধারালো দা-য়ের এক কোপে আম্মার মুণ্ডটাকে ধড় থেকে আলাদা করে দিল। বড় ভাইয়ের গলার নলি কেটে দিলে তারও শেষ রক্ষা হয়নি। নুরুল পলাতক। পুলিশ বাহিনী এসে দেহ দুটোকে তুলে নিয়ে গেছে।
আর এক ঘৃন্য কাণ্ড ঘটেছে মজিদ মাতালের বাড়িতে। বাঁশবাগানে মাতালদের আড্ডা বসে। সেখানে মদ গিলে প্রতিদিন বাড়ি ফেরে মজিদ। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি দেয় বেটি, বউকে। কিন্তু আজ যা শোনা গেল, তা বলার যোগ্য নয়। তেরো বছরের বেটি রুবিনার উপর চলতো নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন। আম্মা ফেরাতে পারেনি। বাধা দিলে জুটত বেদম মার। আজ আম্মার সহ্যের সব বাঁধ ভেঙে গেছে, যখন শুনেছে বেটির শরীরে আস্ত এক প্রাণ বড় হয়ে উঠছে। অমনি বেটিকে নিয়ে সোজা থানায় গিয়ে নালিশ জানিয়ে এসেছে। পুলিশ এসে মজিদকে কোমরে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে গেছে।
ফারহান বাড়িতে খেতে এসে মজিদকে এই অবস্থায় দেখতে পেয়ে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করতে লাগল। আজ আর কাজে যাবে না বলে স্থির করেছে। বিষাদে ভরে উঠল মন। কত কী মনে উদয় হতে লাগল, মানুষ এত নিচ হতে পারে! যাকে জন্ম দিল, তার উপর এমন ….. ! আমার ভেতরে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। কাকে বলে একটু শান্তি পাব? হায় আল্লা! এরা জঙ্গলের পশু। এদের মানুষ করবে কে? এই আমাদের সমাজ! এ তো জাহান্নামের চাইতেও খারাপ। …..। আরও ভাবতে লাগল, জীবনে যত দুর্ভাগ্যই ফিরে আসুক, রবিউলের কারখানার কাজটা আমি ছেড়ে দিবো।
পরদিন কাজে গেল না ফারহান। আব্বুর শরীর খারাপ বলে ছেলেমেয়েরাও স্কুলে যায়নি। বিকেলে আফসানা বলল, আব্বু, মাঠে একটুখানি খেলতে যাব? ফারহান এতদিন নিষেধ করলেও আজ আর না বলল না। চার ভাই-বোনে মিলে খেলতে গেল বল খেলার মাঠে। খেলতে খেলতে আফসানার কী মনে হল, আরশাদকে নিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে গিয়েছিল বাজি কারখানার একেবারে কাছে। ঠিক তখনই নিমেষে ঘটে গেল ভয়ংকর ঘটনা। বিরাট মাপের বিস্ফোরণ। বিল্ডিংয়ের দেওয়াল ভেঙে পড়েছে। ছাদ চৌচির হয়ে চারদিকে ছিটকে পড়েছে। সেই টুকরো গিয়ে পড়েছে অন্ততঃ তিনশো মিটার দূরে। আগুনের শত শত গোলাও চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে দাউদাউ করে জ্বলছে।
খবর এল ফারহানের কাছে। উদভ্রান্তের মতো ছুটে গেল সে। কিছুক্ষণ বাদে সাংবাদিক বন্ধুরাও হাজির হল। পুলিশ বাহিনী এল। দমকল এল। চারদিকে লোকে লোকারণ্য। আগুন নেভানোর চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে বোমা শনাক্তকারীগণ সহ ফরেনসিকের লোকেরা এসে হাজির হয়েছেন। জেসিপি গাড়ি আনা হয়েছে। চলতে থাকল উদ্ধারকাজ। ক’জন মারা গেছে, এখনই বলা সম্ভব নয়। তিনজন শিশুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে মাঠের কোণে। রেহেনা, সামাদ মাঠের ধারে পড়েছিল অর্ধ সংজ্ঞাহীন অবস্থায়। ওদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু আফসানা, আরশাদ কোথায়? উন্মাদের মতো খুঁজে বেড়ায় ফারহান। নির্মম খবরটা আনোয়ারার কানে গিয়ে পৌঁছালো। জাবিরের অত্যাচার আর জীবন-যন্ত্রণায় এমনিতেই তার কান্নার শেষ নেই। সেই কান্না এখন জোরালো হয়ে চার দেয়ালের ভেতরে-বাইরে অনুরণিত হতে লাগল।
এদিকে ঘটনাস্থলে জেলাশাসক, জেলা পুলিশের বড়কর্তা এসে হাজির হয়েছেন। সাধারণ মানুষ পুলিশের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগ্রে দিচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা এসে আগুনে ঘি ঢালছেন। রবিউলের অসাধু অনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে তাঁরা এবার প্রশাসনিক কর্তাদের মুখোমুখি হয়েছেন। এরই মধ্যে খবর পাওয়া গেল – কারখানার ভেতরে যারা ছিল, তারা কেউই বেঁচে নেই।
পুলিশের লোকেরা টুকরো টুকরো হাড়গোড় কুড়িয়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করেছে। ফরেনসিকের লোকেরা সেগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন। বাচ্চাদের হাড়গোড় বলেই তাদের মনে হল। ফারহান বুঝল, তার আদরের আফসানা, আরশাদ আর বেঁচে নেই। মুহূর্তে জ্ঞান হারালো সে।
এলাকার বাইরে ছিলেন হাজি মোড়ল। ইতিমধ্যে তিনি ঘটনাস্থলে এসে হাজির হয়েছেন। ফারহানকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে পুলিশের কর্তাকে ধমকের সুরে বললেন, একে হাসপাতালে নিয়ে যান। মূল সাক্ষী, কারখানার একমাত্র জীবিত কর্মচারী। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জ্ঞান ফেরাতেই হবে। অফিসার, বাজি কারখানার আড়ালে আসলে কী তৈরি হতো, সবটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। অফিসার ছোট করে বললেন, প্রধান সাহেব, এভাবে বলছেন কেন? রবিউল সাহেব আপনাদের দলেরই নেতা। অফিসার, নেতা-ফেতা বুঝিনা, আমি চাই আসল রহস্যটা সামনে আসুক। আইন আইনের পথেই চলবে।
অফিসার সমস্যায় পড়লেন। ভাবতে লাগলেন, দলে এত গোষ্ঠী-কোন্দল, এ অবস্থায় আমি এখন কী করবো? তবুও পকেট থেকে মোবাইল বের করে কারো সাথে যোগাযোগ করবার জন্য বোতাম টিপতে লাগলেন। ফের ধমক দিলেন হাজি, অফিসার, জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন? পুলিশকর্তা একটু যেন চমকে উঠলেন। বললেন, এখান থেকে এক-দেড় কিমি দূরেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। গত বছর আপনার হাত ধরেই উদ্বোধন হয়েছিল। ওখানেই নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করছি। পাশেই দাঁড়িয়েছিল স্থানীয় এক সিভিক পুলিশ। সে ঠোঁট নাড়তে নাড়তে বলেই ফেলল, স্যার, নামেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ওখানে এখন গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। বরং পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ভালো। হাজি কিছুটা লজ্জিত বোধ করে একটু দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ালেন। দুজন কনস্টেবল আর একজন সাব ইন্সপেক্টর ফারহানকে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলল সদরে পুলিশ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
ঘন্টা খানিকের মধ্যেই হাসপাতালের শয্যায় ফারহানের জ্ঞান ফিরে এল। এবার জিজ্ঞাসাবাদের পালা। ফারহান, যা সত্য, নির্ভয়ে জীবনের পরোয়া না করে, তা-ই বলে দিল। ফরেনসিকের অফিসারও রিপোর্টে তেমনই ইঙ্গিত দিলেন। কিন্তু পরদিন পুলিশকর্তা আদালতে বিচারকের সামনে তদন্তের যে রিপোর্ট পেশ করলেন, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। রবিউল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিবৃতি দিল, জনাব, আমি নির্দোষ। তারপর মুখ লুকিয়ে অদ্ভুত মুচকি হাসি হাসল। বিচারকের বিচারে নির্দোষিতা প্রমাণ হয়ে গেল রবিউলের।
কয়েকদিনের মধ্যে জায়গা বদল করে রবিউল নতুন কর্মচারী নিয়োগ করে কারখানা চালু করে দিল। সরকারের কাছ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতিও আদায় করে নিল।
ফারহান ছেলেমেয়েদের অকাল মৃত্যুর যন্ত্রনা ভুলতে পারেনা। সুবিচারের আশায় দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে লাগল। পথে পথে আন্দোলনের ঢেউ উঠল। বিরোধীদের হাতে আন্দোলনের রাশ চলে যেতে বসেছে দেখে সরকার কিছুটা নড়েচড়ে বসল। দলের রাজ্য নেতৃত্ব প্রতিনিধি পাঠালেন ফারহানের বাড়িতে। সাথে রবিউলও এল। পরিকল্পনা মাফিক দশ লক্ষ টাকার চেক তাঁরা তুলে দেবেন ফারহানের হাতে। আর রবিউল তার কারখানায় ফারহানকে ফের নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেবে।
ফারহান এতটাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে, কোনটাই সে গ্রহণ করল না। প্রতিনিধিগণ ফারহানের বাড়ি ছাড়লেন। সাংবাদিক বন্ধুরা এ খবর ঢালাও করে প্রচার করতে লাগল। উপরের লোকজনের আসার কথা শুনে ভানুবিবি আগেই চলে এসেছিল। ফারহানকে কানে কানে বলল, বেটা, তুই ভুল করে ফেললি। চেকটা নিলেই ভালো করতিস। কারখানার চাকরিটাও হাতছাড়া করে ভুল করলি। ফারহান কোনদিন বুবুকে অসম্মান করেনি। আজ এই প্রথমবার বীতশ্রদ্ধ হয়ে বলল, টাকায় আমার পুত্রশোক নিবারণ হোক, দুঃখ-যন্ত্রণা লাঘব হোক, এটাই তুমিও চাও বুবু? চাইবোনা তো কী? যারা মরে গেছে, তাদের তুই ফিরা পাইবি? বোকা না হলে এতগুলো টাকা, চাকরির সুযোগ হাতছাড়া করে কেউ? এখনও সুযোগ আছে। যা, প্রতিনিধিরা বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ডাইকা আইনা চেক আর চাকরিখান ফিরাইয়া নে। বুবু, আবার তোমাকে বুলছি, শ্যাষ বারের মতো বুলছি, ও কাজ আমার দ্বারা হবি না। আমার আফসানা, আরশাদের আত্মা শান্তি পাবে না। তুই ভুল করলি, ফারহান। সায়রাকে শাদি করবিনা, তো না কর্। আনোয়ারা আবার তোর কাছে ফিরা আসতে চাইছে। জাবির ওকে কষ্ট দিচ্ছে। আনোয়ারাকে ফের শাদি কইরা সংসার কর্। আফসানা, আরশাদের মতো ব্যাটা-বেটি আবারও হবে।
ফারহান এবার তার দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত করতেই বুবু রাগ করে ফিরে গেল বাড়ি। এই নিদারুণ দিনে সায়রার দেখা মিলল না। দিন কয়েক পর সিরাজনগর থেকে করিম চাচা এল কাশেমপুরে, লেবারের খোঁজ করতে। ফারহানকে ডেকে বলল, একটা ছোটখাটো ঢালাই হবে। দিন চারেকের কাজ, করবা তুমি? মনের অবস্থা ভালো নাই চাচা। কাজ না করলেও চলবি না। ছেলেমেয়ে দুটো হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরা আইছে। ওষুধ-পত্যি কিনতে হবি। করিম চাচা দুঃখ প্রকাশ করে বলল, ফারহান, তোমার সব কথাই আমি জানি। কী আর করবা! আল্লা হয়তো এমনটাই চাইছিলেন। না চাচা, আল্লা চাননি। আমার নিষ্পাপ ছেলেমেয়েদের মারতে আল্লা চাননি। ঐ বাজি কারখানার আড়ালে যদি বোমা বানানো না হতো, তবে কি আমার আফসানা, আরশাদ মরতো? কিন্তু ফারহান, ওই কারখানায় তুমিও তো কাজ করতা। করতাম, প্যাটের দায়ে। তবে দোষ আমারও। বড় বড় টাকার নোট দেখে আমারও মনে পাপ বাসা বেঁধেছিল। ক্ষ্যামতার লোভে কিছু মানুষ অমানুষ হয়, পিশাচে পরিণত হয়। সেই নরপিশাচরা মুখে বেহেস্তের কথা বুলতে বুলতে দ্যাশটাকে আসলে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেয়। আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষকেও ঐ পথে টাইনা নিয়া যায়। বুঝেছি, ছেলেমেয়েদের মৃত্যুর জন্য তুমি নিজেকেও দায়ী করছো। আর সেই পাপের সাজা তুমি পাইতেছো। কিন্তু বুলতো বাপ, পাপ না করেও তো কত মানুষ সাজা পাইতিছে, তাই বা কেন? চাচা, কাদের কথা বুলছো তুমি? ফতেপুরের কামাল আর জামাল, দুইটাই যুবক ছেলে, কলকাতায় কাজে গেছিল। প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে কাজ করতো। রাইতের বেলায়ও কাজ হইতো। গত পরশু রাইতে আগুন লেগেছিল। সব পুইড়া ছাই হয়ে গেছে গো। খবরে শুনলাম, অনেকেই বেরুতে পারেনি। ফতেপুরের ঐ ছেলে দুইটার আধপোড়া হাড়গোড় ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। চাচা গো, চারপাশে দেইখাশুইনা মনে হইতেছে – যত শাস্তির বিধান গরিব, খেটে খাওয়া মানুষেরই উপর। অসময়ে যত মরণ এদেরই বেশি হয়। তার মধ্যে আবার মুসলমানরাই বেশি মরছে। ফারহান, এযাবৎকাল তো তাই-ই হয়েছে। আজও হইতেছে। কথা কী জানো, আল্লা বুলো, ভগবান বুলো, তিনি তো মানুষ সৃষ্টি করিছেন। আর ধনী-গরিব ভাগ করিছে মানুষেরা। গায়ের জোরে, অর্থের জোরে, ক্ষমতার জোরে একদল মানুষ উপরে উঠতে চায়। ধনী থেকে আরও ধনী হইতে চায়। সর্ব সুখ তারাই কাইড়া নিতে চায়। এই লড়াই যেন অনন্তকাল ধইরা চলিছে। তাতে মরে বেশি দুর্বলরাই। সর্বশক্তিমান উপরওয়ালা, তিনি যদি সত্যিই থাইকা থাকেন, হয় তিনি এই লড়াই থামাতে পারতিছেন না নয়তো তিনি এই লড়াই থেইকা দূরে থাকতে চান। কী বুলছো তুমি, চাচা! হ্যাঁ ফারহান, সেই কারণেই প্রদীপের নিচের অন্ধকার কখনও দূর হয় না। তাহলে তো এই লড়াই, ওই অন্ধকারে পড়ে থাকা মানুষগুলোকেই লড়তে হবে। কিন্তু দুর্বল সবলের সাথে পেরে উঠবি কী করি? এসবের আমি কিছুই জানিনা। চাচা, তুমিই বুলতে পারবা। তুমি গরিব হলেও অনেক দূর অবধি লেখাপড়া করিছো, কত জ্ঞানীগুণী মানুষের সাথেও মেলামেশা করিছো। বই-পুস্তক পড়ছো। আমি আজ পর্যন্ত ভালোমন্দ যেটুকু শিখেছি, তোমার কাছ থেইকাই। দেখ ফারহান, দুনিয়ার যত অসাধ্য সাধন, উপরতলার সুখী মানুষেরা করেনি। ক্ষুধার্ত কঙ্কালসার শ্রমজীবী মানুষেরাই করিছে। আর একটু আগে বুললে না – গরিব মুসলমানরাই বেশি মরছে, কারণ কী জানো? অশিক্ষা, কুশিক্ষা, আর ধর্মের নামে কুসংস্কার, কুপ্রথার জিহাদ ছাইড়া মুসলমানরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হইতে পারতিছে না। নিজেরা নিজেরাই মারামারি কইরা মরতিছে।
চাচা, প্রতি শুক্রবার মসজিদে আমি যাইতে পারি না। সময় পাই না। এখন তো ভাবছি, সময় পাইলে তোমার মতো মানুষের কাছে যাওয়াই ভালো। গেলে ভালো কিছু শিখতে পারবো। সে না হয় তুমি যাইবা ফারহান। তবে একটা খবর তোমাকে দিতে ভুলে গেছি। তোমার ছোট্ট শালি সায়রার কথা শুনেছো? সে তো দিল্লিতে চলে গেছে। কাশেমের সেজো ছেলে নাজিমুল ওখানে সাটারিংয়ের কাজ করে। শুনলাম – নাজিমুলকে শাদি করিছে সায়রা।
আকাশ থেকে পড়ল যেন ফারহান। তবে কি তাকে সায়রা ভালোবাসেনি, মিছামিছি নাটক করিছে এতদিন? যাক ভালই হয়েছে ওই সর্বনাশের পথে পা না বাড়িয়ে। করিম চাচা জিজ্ঞেস করল, কী ভাবছো ফারহান? না, কিছু না,চাচা । তবে একটু অবাক না হয়ে পারছি না। কাশেম তো রক্তের সম্পর্কে সায়রার আপন চাচা। আবার নাজিমুল তো সায়রার থেইকা দু-তিন বছরের ছোট। আরে বাপ, পিরিতে মজিলে মন, কেবা বাছে ছোট-বড়, কেবা বাছে রক্তের আপনজন? ওই যে কী বলে? ফেসবুক, শুনেছি – ফেসবুকে কথা বুলতে বুলতে ছোট ভাইয়ের সাথে প্রেম। এবার তো তাকে স্বামীর আসনে বসিয়ে দিল। সমাজটা একেবারে গোল্লায় চইলা গেল, ফারহান।
সন্ধ্যার অন্ধকার নামল কাশেমপুরের নীল আকাশের নিচে। রাত পোহালে তাহলে চইলা যাইও কাজে, চললাম গো, এই বলে বাড়ির পথে পা বাড়ালো করিম চাচা। ফারহানের ভেতরটা আবারও চিরতরে হারিয়ে যাওয়া বেটা-বেটির জন্য কাতর হয়ে উঠল।
(ক্রমশঃ)
…………………………………………………….