লঙ্কায় পুতুল সরকার | Lankay Putul Sarkar

অণুগল্প (কল্পনাপ্রসূত)  
লঙ্কায় পুতুল সরকার  – হরবিলাস সরকার

 

সেই সুদূর অতীত আজও কত কথা বলে! অস্ফুট স্বরে বলে, রামচন্দ্র সীতা উদ্ধারে লংকায় গিয়েছিল। বন্ধু হিসেবে পেয়েছিল এক গোবেচারা, নিতান্তই শান্তিপ্রিয় মানুষ বিভীষণকে। তাই বলে কি তাঁর রাজপাটের  প্রতি বাসনা ছিল না? সেই সুপ্ত বাসনার কথা মুখ ফুটে ব্যক্ত না করলেও রাম তা মনের গভীরে উপলব্ধি করেছিল। আরও উপলব্ধি করেছিল — ভেতরে নিশ্চয়ই কোনো গভীর ব্যথার ক্ষত আছে বিভীষণের। সেই ক্ষতে রামের শীতল স্পর্শ দুজনকে নিবিড় বন্ধনে জড়িয়েছিল।

হে অতীত, এবার বিস্তারে বল সেদিনের লঙ্কাপুরীর কথা। শ্রোতাবন্ধু, শোন তবে —

lankay putul sarkar 2

বিভীষণের বড় দাদা ‘কুম্ভকর্ণ’ ছ’মাস ঘুমায়, ছ’মাস জাগে। একারণে লঙ্কার রাজবংশের  সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষ হয়েও তাঁর মাথায় রাজমুকুট ওঠেনি। ফলে রাবণের ভাগ্যে সহজেই জুটেছিল লঙ্কার সিংহাসন। কিন্তু তাঁর অত্যাচারে, আচার-ব্যবহারে প্রজারা, এমনকি বিভীষণও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ছোট ভাই হয়েও তাঁর ভেতরে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল। বেচারা শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় দিন গুনছিল।

সীতার অপহরণ কাণ্ড সেই সুযোগ এনে দিল। তবুও একই মায়ের পেটে জন্ম, একই রক্তের ধারা প্রবহমান শরীরে, কী করে দাদার ক্ষতি চাইতে পারে বিভীষণ? অন্যদিকে আবার সীতার কষ্ট তাঁকে বড়ই ব্যথিত করে তুলেছিল। শেষবারের মতো সে  দাদার দু’পা ধরে অনুরোধ করল, সীতাকে তুমি রামের হাতে ফিরিয়ে দাও। ক্রোধে অন্ধ দাম্ভিক রাবণ সে অনুরোধ উপেক্ষার আঁস্তাকুড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েই ক্ষান্ত হল না, বিভীষণের কপালে লেপে দিল চরম অপমানের চিহ্ন। তীব্র দহন জ্বালায় জ্বলতে থাকল বিভীষণ। আর রাবণ সদর্পে বেরিয়ে গেল যুদ্ধক্ষেত্রে। 

প্রবল পরাক্রমশালী রাবন আর তাঁর বীরপুত্র মেঘনাদের সামনে অসহায় রাম যখন পরাজয়ের প্রহর গুনছে, লক্ষ্মণ শক্তিশেলের আঘাতে প্রাণ ওষ্ঠে নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, হনুমান বৈদ্যরাজ ‘সুশেনে’র পরামর্শে আকাশ পথে গন্ধমাদন পর্বতের উদ্দেশ্যে ছুটেছে বিশল্যকরণী আনতে, ঠিক তখনই  বিভীষণ সামনে এসে সখ্যতার দু’হাত বাড়িয়ে দিল। রাম বুঝল, বিভীষণের এই বন্ধুত্ব নিখাদ।

রামও দু’হাত বাড়িয়ে দিল। বিভীষণ তখন কানে কানে মন্ত্র দিল, সখা, মহা পরাক্রমশালী রাবণ আর মহাবীর মেঘনাদকে তুমি কোনভাবেই পরাস্ত করতে পারবে না। পরাস্ত করবার উপায় আমি জানি। বড়ই উৎসুক হয়ে রামচন্দ্র জানতে চাইল, সখা, কী সেই উপায়? শুধুমাত্র নিরস্ত্র অবস্থাতেই মেঘনাদকে মারা সম্ভব। কিন্তু সখা, নিরস্ত্র অবস্থায় কাউকে মারা বীরের ধর্ম নয়, অন্যায়। হে রাম, ন্যায়ধর্ম দ্বারা যুদ্ধে জেতা যায় না। শত্রুপক্ষের দুর্বলতা বুঝে আঘাত করাই শ্রেয়। ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যায়কে প্রয়োজনে অন্যায় দিয়েই দমন করতে হবে। নাহলে তা হবে মুর্খামি। রাম মনে মনে ভাবল, এ শুধু উপদেশই নয়, এক অসাধারণ বিচক্ষণতার পরিচয়। বিভীষণ এবার বলল, লঙ্কার রাজা রাবণের মৃত্যুবাণ সুরক্ষিত আছে তাঁর স্ত্রী ‘মন্দোধরি’র কক্ষে। রাম জিজ্ঞেস করল, সেই মৃত্যুবাণ কীভাবে আনা সম্ভব? আমার বিশ্বাস, সেই মৃত্যুবাণ আনতে পারবে তোমার পরম ভক্ত অসীম ক্ষমতাশালী একমাত্র হনুমান।

রাম তখন হনুমানের পথচেয়ে বসে রইল। হনুমানও যথাসময়ে বিশল্যকরণী নিয়ে এল। লক্ষ্মণ সুস্থ হয়ে উঠল। এরপর বিভীষণের সহযোগিতায় এবং পরিকল্পনায় লঙ্কাপুরীর মন্দিরে নিকুম্ভিলা যজ্ঞরত নিরস্ত্র মেঘনাদকে অতর্কিত আক্রমণে নিধন করল লক্ষণ। আর হনুমান সুকৌশলে  চুরি করে আনল রাবণের ‘মরণের মৃত্যুবাণ’। সেই বাণ ছুঁড়ে রাবণকে হত্যা করল স্বয়ং রাম।

lankay putul sarkar 3

উদ্ধার হল সীতা। পাশে রাম, লক্ষ্মণ, হনুমান। তাঁদের আনন্দের নয়নাশ্রুর অংশীদার হতে বিভীষণ সামনে এসে দাঁড়াল। অনুরোধ করল, রাম, এবার লঙ্কায় তোমার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা কর। মনে মনে ভাবল, এতকাল ধরে যে বাসনা আমার মনের মধ্যে সংগোপনে বিরাজ করছিল, তা লঙ্কার মাটিতে রামের পদার্পণ না ঘটলে কোনদিনই পূর্ণ হবার সুযোগ ছিল না। সেই বাসনা পূর্ণ হবার কথা স্বয়ং রামচন্দ্রই নাহয় নিজের মুখে প্রকাশ করুক। বন্ধুত্বের প্রতিদান হিসেবে এটুকু আমার পাবারই কথা। বিগলিত হৃদয়ে রামচন্দ্র চিন্তা করল অন্যকিছু, আগামী পৃথিবীর মানুষ যেন না ভাবে — রাম লঙ্কায় গিয়ে রাবণ হয়েছিল। অতএব, পররাজ্য দখল নয়, অন্যভাবে সেই সুবিধা ভোগ করাই শ্রেয়। কার্যও সিদ্ধি হবে, রামচন্দ্রের মহিমার কথাও জগৎ জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। এমনটা ভেবেই সে মৃদু হেসে বলল, সখা বিভীষণ, লঙ্কার মাটিতে আমি না থাকলেও আমার ছায়াশরীর আজীবন থাকবে। কিন্তু উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে বসবে তুমি।

lankay putul sarkar 1

বিভীষণ রামকে ধন্যবাদ এবং বিদায় জানিয়ে সিংহাসনে বসল। আজকের দিনের পরিভাষায় বলব — ‘লঙ্কায় গঠিত হল পুতুল সরকার’।


……………………………………………………

Leave a Comment