বিবেকের আদালত
( গল্প – রূপক ধর্মী )
বিবেকের আদলত
হরবিলাস সরকার
“ছেলেটি
ছুরির পর ছুরি চালিয়ে প্রিয়তমার জীবন কেড়ে নেওয়ার পরও প্রেম নিবেদন করে গেল , ‘তোমাকে রক্ত ভেজা গোলাপ উপহার দিলাম।’ এ কোন্ প্রেম,
কেনইবা এই পরিণতি?” বিচারক
উকিলকে প্রশ্নটা করলেন।
“ ধর্মাবতার,
এ প্রশ্ন তো আমারও,”
কথাটা পাল্টা ছুঁড়ে দিয়ে
উকিল সাহেব বিচারকের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“ ডাকুন তাহলে মনোবিদকে কাঠগড়ায়, দেখি উনি কী বলেন। ”
মনোবিদ
কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ালে উকিল সাহেব তাকে ‘গীতা’ ছুঁয়ে শপথ বাক্য পাঠ করে ভাষ্য দিতে বললেন। মনোবিদ হাতের
ইশারায় একটু থামতে বলে কী যেন চিন্তা করে তারপর মৃদু হেসে বললেন, “না, ‘গীতা’ ছুঁয়ে এ ভাষ্য দেওয়া সমীচীন হবে না।”
“কেন?” “কেননা, ‘গীতা’
ছুঁয়েইতো এবং চৌত্রিশ কোটি দেবতাকে স্বাক্ষী করে প্রথমবার
ছেলেমেয়ে দুটি উভয় – উভয়কে প্রেম
নিবেদন করেছিল খুব সুন্দর গোলাপ দিয়ে।”
বিচারক বললেন, “ঠিক
আছে, ‘গীতা’ ছুঁয়ে শপথ করতে হবে না। বলুনতো – সে গোলাপ রক্তে ভিজলো কেন?”
“মহামান্য
বিচারক মহাশয়, কারণ অনেক হতে পারে।” “কী কী?”
“বলি
তাহলে শুনুন –
এক
নাম্বার : ছেলেটি,
মেয়েটি প্রকৃতই
দুজন – দুজনকে ভালবাসত,
কিন্তু দারিদ্র বা বেকারত্ব বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দুই নাম্বার : ছেলে-মেয়ে দুটি দুজন দুজনকে ভালবাসলেও মেয়েটির বাড়ির লোকের পছন্দ ছিল না।
তিন
নাম্বার : এই মিলনে ছেলেটির বাড়ির প্রবল
আপত্তি ছিল। মেয়েটি তাকে ঠকাচ্ছে
এরকম একটি মিথ্যা নাটক করে ছেলেটির মাথা
বিগড়ে দেওয়া হয়েছিল।
চার
নাম্বার : মেয়েটি সত্যি সত্যিই অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল।
পাঁচ
নাম্বার : ছেলেটি অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলেছিল, তাতে প্রথম মেয়েটি বাধা হয়ে
দাঁড়িয়েছিল।
ছয়
নাম্বার : মেয়েটি প্রকৃতই ভালোবাসলেও ছেলেটি মিথ্যা অভিনয় করেছিল । আসলে ভ্রমরের মতো ফুলে বসে মধু খেতে চেয়েছিল । ছলনা
বুঝতে পেরে মেয়েটি ছেলেটির শাস্তি চেয়েছিল।
সাত
নাম্বার : ছেলেটি প্রকৃতই ভালোবাসলেও মেয়েটি মিথ্যা অভিনয় করেছিল। আর ছেলেটি এই ছলনা বুঝতে পেরে হিংস্র হয়ে উঠেছিল।
আট
নাম্বার : রূপের মোহ আর যৌবনের চাঞ্চল্যে একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। কিন্তু জাত-পাত,ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে নানা
জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল ।
নয়
নাম্বার : বিষয়-আশয়কে কেন্দ্র করে পূর্ব কোন বিবাদের প্রতিশোধ নিতে প্রেমের
ছলনা , তারপর স্পৃহাকে চরিতার্থ করা ।
দশ
নাম্বার : রাজনৈতিক কোন বিবাদের প্রতিশোধ নিতে প্রেমের ছলনা, তারপর সুযোগের
সদ্ব্যবহার ।
বিচারক
এবার ভাষ্য থামিয়ে মনোবিদকে জিজ্ঞেস করলেন , “আপনার আর কতগুলো নাম্বার বাকি আছে?”
মনোবিদ সহাস্যে উত্তর দিলেন, “মহাশয়, আরও কয়েকটা ……।” “ থাক্, যা বললেন তার মধ্যে কোনটা?” চটজলদি উত্তর, “এক নাম্বার নিশ্চিত। এর সাথে দুই আর চার নাম্বারও যুক্ত করা যেতে
পারে। ”
বিচারক
ভাবতে বসলেন, তারপর বললেন – সে যাইহোক, উকিলসাহেব, আপনি বরং পুলিশের বড় কর্তাকে
ডাকুন।” “হ্যাঁ ধর্মাবতার,” বলে উকিল গলা চড়ালেন, “ডিজি
সাহেব, আপনি কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ান।”
কাঠগড়ায়
দাঁড়ালে ডিজি প্রশ্নের মুখে পড়লেন, “দিনের আলোয় এভাবে খুন হয়ে গেল, আপনারা কি
ঘুমোচ্ছিলেন?” “উকিল সাহেব, উদ্দেশ্য যদি ‘কেউ কাউকে খুন করবেই’ এমন হয়, তবে তা আটকানো মুশকিল। বিশেষ করে এই প্রেমঘটিত খুন। কেননা, আমরা জানবো কী করে – কে কাকে কাছে টানবে অথবা কে কাকে দূরে সরিয়ে
দেবে?”
“তাহলে
কে জানবে?” ডিজি এবার উত্তর দিলেন, “মহামান্য আদালত, মনোবিদের কথা অনুযায়ী এখানে
দারিদ্র বা বেকারত্ব বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, অর্থনৈতিক ব্যাপার, অতএব,
অর্থমন্ত্রীকে তলব করলে ভালো হয়। ”
বিচারকের
নির্দেশে উকিল অর্থমন্ত্রীকে তলব করলেন। প্রশ্নবাণ ছুঁড়লেন, “দেশে বেকরত্ব ক্রমবর্ধমান এবং
তা ঘর বাঁধার স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। জন্ম নিচ্ছে হতাশা, অবসাদ, মহাশূন্যতা। আর তা প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই
দায় কি আপনি এড়াতে পারেন? যুবক-যুবতীদের স্বনির্ভর
করানোর দায়িত্ব কি আপনার নয় ?”
“মহামান্য
বিচারক, এর উত্তর আপনাকে দিচ্ছি, শুনুন তবে । সমাজটাতো পুঁজি নির্ভর। শিল্পপতিরা ব্যাপকভাবে পুঁজি না ঢাললে কলকারখানা
গড়ে উঠবে কী করে? কর্মসংস্থান হবে কী করে ?”
বিচারক
মাথা ঝাঁকালেন, জানতে চাইলেন – “বড় শিল্পপতি কোথায়, উনি কি এসেছেন ?”
বড়
শিল্পপতি কাঠগড়ায় এসে বললেন, “মহাশয়, কাটমানি, হিস্যা , তোলাবাজির অত্যাচারে আমরা
শিল্প গড়ব কী করে? যদিওবা শিল্প গড়ে ওঠে সেখানে কর্মসংস্থান হবে অতি নগন্য।”
“কেন,
কেন, নগণ্য কেন ?” “বিজ্ঞানীরা জগৎকে অত্যাধুনিক
প্রযুক্তি উপহার দিয়েছেন । আমরা তা ব্যবহার করে সুফল পাচ্ছি। বেশি লোকের কাজ অল্প লোক দিয়ে করে দু`পয়সা লাভ
করছি। এতে দোষ কীসের? তবে মানুষ যদি খুনোখুনি
করে মরে, পশুর মত হিংস্র হয়ে ওঠে, এটাতো কালচার অর্থাৎ সংস্কৃতির ব্যাপার। তা দেখভালের জন্য তো সংস্কৃতি মন্ত্রী আছে।”
বিচারকের
দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সংস্কৃতিমন্ত্রীর উপর। “ওই তো সংস্কৃতিমন্ত্রী। আপনি বসে আছেন
কেন? আসুন কাঠগড়ায়।”
সংস্কৃতিমন্ত্রী
কাঠগড়ায় আসার ফাঁকেই মনোবিদ তাঁর আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, “বিচারক মহাশয়, সমাজে এখন
বিনোদনের মাধ্যমগুলো যা সৃষ্টিসম্ভার নিয়ে নিয়মিত হাজির হচ্ছে ,তাতে
মানুষের মনে প্রতিনিয়ত কুপ্রভাব বিস্তার
লাভ করছে। টিভির পর্দায় বা মোবাইল ফোনে বানিজ্যিক সিনেমা, ধারাবাহিক,
বিজ্ঞাপন, পর্ণগ্রাফি ইত্যাদি উপাদানগুলো সুস্থ এবং ভালো চরিত্র
গঠনের পক্ষে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর
তার সাথে রমরমিয়ে চলছে মদের ব্যবসা। ”
বিচারক বলে উঠলেন, “আপনার নিশ্চয়ই আর কোন নাম্বার বাকি নেই। বেশ, এবার বসুন। ”
সংস্কৃতিমন্ত্রী
বললেন, “মহাশয়,
সবকিছুই এখন বানিজ্য
ভিত্তিক। বাজার চাঙ্গা করতে যা যা করণীয়
সেটুকু করা হয়। আর আবগারি দপ্তর থেকে সরকারের কোষাগারে প্রচুর অর্থ আসে। তা না
হলে দেশ চলবে কী করে?”
এজলাসে
উপস্থিত বিশিষ্ট এক সমাজসেবী এসময় বিচারকের অনুমতি নিয়ে কিছু বলতে চাইলেন।
অনুমতি মিলল। তিনি বললেন,
“মহামান্য আদালত, সবই তো শুনলেন,
সবই অনুভব করলেন। এইতো
আমাদের সমাজ। এখানে জীবনের স্বপ্নগুলো মরে যায়। সুকুমার প্রবৃত্তিগুলো লুপ্ত হয়ে
যায়। ফুটে ওঠা ফুলেরা অনাদরে শুকিয়ে
যায়। অসহায় বিবেক গুমড়ে গুমড়ে কেঁদে ওঠে দানবের ঔদত্যে। চারদিকে শুধুই অন্ধকার। পুঁজির এই ভুবনে আলোর পথ রুদ্ধ। চাই
নতুন কোনও ভুবন, নতুন ভোরের আলো। ”
বিচারক
এবার উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,
“আজকের মতো বিচারসভা এখানে
শেষ হল। আগামিকাল যথাসময়ে আবার বিচারসভা শুরু হবে এবং রায়দান হবে। ”
পরের দিন
বিচারকের
সামনে মেয়েটির পক্ষের উকিল মেয়েটির মাকে তার মনের কথা বলতে বললেন। মেয়ে হারা
পাষান প্রতিমা মা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দূরের পানে তাকিয়ে
রইলেন। তার অশ্রুসজল নয়নে ভেসে উঠলো কত স্মৃতি। মনে পড়ছে তার ছোট্ট খুকুর কথা।
কত আদর, যত্নের মধ্যে দিয়ে সে বড় হয়ে উঠেছিল। কত
স্বপ্ন দেখেছিল। নিমেষে একটা ঝর এসে সব শেষ হয়ে গেল।………।
উকিল
সাহেব এবার অনুরোধ করলেন,
“বলুন মা। ”
মায়ের
ভেতর থেকে বেরিয়ে এল দীর্ঘনিঃশ্বাস। বলল,
“ধর্মাবতার, ‘ওই’
ছেলেটা আমার মেয়েকে ‘রক্ত
ভেজা গোলাপ’ উপহার দিয়েছে। ‘ওকে’ দেবার মতো আমার কিছুই নেই। তবু দুফোঁটা চোখের জল রেখে
গেলাম। আপনি ‘ওর’
হাতে তুলে দেবেন। আর একটা
আর্জি জানিয়ে যাই – সমাজের আর কোন মায়ের যেন এমন করে কোল শুন্য না হয়। আর
আমার কিছুই বলবার নেই। ” বলতেই জ্ঞান হারালেন মা ।
বিচারক
বললেন, “মানুষের চৈতন্যোদয় হোক।” এরপর তিনি রুমালে চোখ মুছলেন। তারপর ছেলেটির
আমৃত্যু জেলের ভেতরে থাকার শাস্তি ঘোষণা করে ভেতরে চলে গেলেন।







